রাত ৯:৪৯, বৃহস্পতিবার, ২৯শে জুন, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / খুকির টিয়া পাখি
খুকির টিয়া পাখি
মার্চ ৩১, ২০১৭

মো. মাঈন উদ্দিন:কালবৈশাখী ঝড়ে সেদিন প্রকৃতি লন্ড ভন্ড হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সঙ্গে শীলাবৃষ্টি হওয়ায় প্রাণীকূলও পড়েছিল অস্তিত্ব রক্ষার হুমকিতে। ঝড় থামল বটে কিন্তু তখনো টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল।  খুকি দৌঁড়ে বের হয়ে গেল আম কুঁড়াতে। কিছু দূর এগুতেই সে সামনে মৃত পাখি দেখতে পেল। একটা নয় দুইটা নয়, অনেকগুলো! নিঃপ্রাণ পাখির নিথর দেহ দেখে খুকুর মন ভারাক্রান্ত হলো।

সে আম কুঁড়ানোর কথা একেবারেই ভুলে গেল। দু’পা সামনে এগুতেই তার চোখে পড়ল একটি টিয়া পাখির ফুটফুটে ছাঁনা, মরা পাতার নিচে হামাগুড়ি দিয়ে লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। থমকে দাঁড়াল খুকি। তার কৌতুহলী দৃষ্টি ঐ টিয়া ছাঁনার প্রতি। ছাঁনাটি হয়তো তার মা-বাবাকে হারিয়ে ফেলেছে। হয়তো তার মা-বাবা এই ঝড়ের তান্ডবে প্রাণ হারিয়েছে। খুকিকে দেখে ছোট্ট পাখি প্রাণের ভয়ে পত্র পল্লবে মুখ লুকালো। খুকির মনে পাখিটির প্রতি গভীর মমতা জন্মালো। সে দুই হাতে পাখিটিকে ঝাঁপটে ধরল। অজানা আতঙ্কে পাখি কিচিরমিচির শব্দে চেঁচিয়ে উঠল।

 কিন্তু ডানা ঝাঁপটানোর শক্তি তার গায়ে ছিল না। খুকির আনন্দ যেন আর ধরে না। সে তার পরনের জামা দিয়ে খাখি-ছানার শরীর হতে পানি মুছে দিল। পাখিও যেন খুকির সোহাগ বুঝতে পারল। আদর পেয়ে কিচিরমিচির বন্ধ করল । খুকি বাসায় ফিরে তার বাবা-মাকে হাতের পাখিটি দেখালো। তার বাবা-মা খুব খুশি হলো। তাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, ‘বাহ্ কি চমৎকার পাখি।’

 

তার বাবা বললেন, ‘কিন্তু মা, পাখিটি ছেড়ে দাও। বনের পাখিকে বনেই সুন্দর দেখায়, ঘরে নয়।’ খুকির অভিমানী উত্তর, ‘কখনো না, এটা আমার পাখি। আমার পাখি অসুস্থ। তার সেবা দরকার। এখন ছেড়ে দিলে সে মরে যাবে।’ তার বাবা আর কোন কথা বললেন না। পরের দিন খুকির বাবা তাকে পাখির খাঁচা এনে দিলেন। খুকি প্রতিদিন ছানাকে খাবার দেয়, পানি দেয়, খুকির যতœ পেয়ে পাখিটি অল্প দিনের মধ্যেই নাদুস-নুদুস হয়ে উঠল। তার গায়ের চিকচিকে সবুজ রং সবার মন কাড়ে।

 খুকি পাখিটিকে নাম দিল-টুকু। অপরিচিত কেউ ঘরে ঢুকলেই টুকু কিচিরমিচির শুরু করে দেয়। সে যেন সতর্কবার্তা পাঠায় ঘরের মালিকের কাছে। খুকি জামা পরে ব্যাগ হাতে স্কুলে যাবে আর এমনি টুকুর দম ফাঁটা কিচিরমিচির। খুকি দৌড়ে এসে টুকুর সামনে দাঁড়ায়-স্কুলে যাবে টুকু? টুকু যেন বলতে চায়-হ্যা আমিও তোমার সাথে স্কুলে যেতে চাই। টুকু স্কুল থেকে ফেরার পর টুকুর আবার সেই চেঁচামিচি। খুকি টুকুর অভিমান বুঝতে পেরে বলে-ও রাগ করেছিস, তাই না? এক মিনিট অপেক্ষা কর, তোর খাবার নিয়ে আসছি।

 

খুকি খাবার নিয়ে এলে টুকুর কিচিরমিচির বন্ধ হয়। খুকি বাহির থেকে খেলাধুলা করে ফিরলে টুকু খুকিকে দেখেই গগনবিদারী চেঁচামিচি শুর” করে দেয়। খুকি খাঁচার সামনে এসে চোখ বড় বড় করে বলে, ‘ও, তোর হিংসা হচ্ছে বুঝি? তুই আমার সাথে বাইরে খেলতে যেতে চাস, তাই না? টুকুর নিরবতা যেন বলতে চায়-হ্যাঁ আমি তোমার সাথে খেলতে যেতে চাই। খুকিকে টিয়া পাখির সঙ্গে এমন অন্তরঙ্গ আলাপরত দেখে তার মা-বাবা চোখ টিপে হাসে।


খুকির গায়ে অসহ্য জ্বালাপোড়া নিয়ে জ্বর আসে। একদিন পরই তার গায়ে গুটি বসন্ত দেখা দেয়। গুটি বসন্ত নিয়ে খুকির স্কুলে যাওয়া বন্ধ। আজ দশদিন হয়ে গেল খুকি বাসায় অঘোষিত বন্ধি। বাবা-মা উভয়েই চাকরিজীবী হওয়ায় তারা সারা দিন বাইরে থাকেন। খুকির একমাত্র কথা বলার সঙ্গী টুকু। খুকি এ ক’দিনে বন্ধুত্বের জ্বালা মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করেছে। তার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। খুকি চিন্তা করছে-অল্প ক’দিনে সে ঘরে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছে অথচ টুকু দিনের পর দিন একা এই খাঁচায় বন্ধি।

 

কত কষ্টই না তার হচ্ছে। সে বিছানা ছেড়ে টুকুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দু’হাতে খাঁচা আলতো করে ধরে স্থির দৃষ্টিতে টুকুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘টুকু তোর খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না? তুই কিছু না বললেও আমি বুঝতে পাচ্ছি। আমি জানি তোর মা-বাবাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। আজ তোর মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর কথা, অথচ আমি তোকে জোর করে খাঁচায় বন্ধি করে রেখেছি। আমার ভুল হয়ে গেছে রে টুকু।’ পরের দিন সকাল বেলা মা-বাবা অফিসে যাওয়ার আগেই খুকি তাদের ডেকে বলল, ‘টুকুকে ছোট্ট খাঁচায় বন্ধি করে রাখা আমাদের একদমই ঠিক হচ্ছে না। তাই টুকুকে আমি মুক্তি দিতে চাই।


খুকির মা বললেন, ‘খুব ভাল কথা।’ খুুকি টুকুর খাঁচার দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘টুকু, তোকে আজ মুক্ত করে দিলাম। তোর যেখানে খুশি উড়ে যা।’ খাঁচার দরজা খোলা পেয়ে টুকু ফুরৎ করে উড়ে বাহিরে চলে গেল। খুকি, তার মা-বাবা উৎফুল্ল চিত্তে টুকুর মুক্তভাবে উড়ার দৃশ্য দেখছে। সবাইকে চমকে দিয়ে টুকু উঠানের চারিদিকে চক্কর দিয়ে আবার উড়ে এসে খুকির মাথায় বসল।

 

কিচিরমিচির করতে লাগলো। সে যেন বলতে চাচ্ছে, ‘খুকি ঐ ঝড়ের দিন আমার মা-বাবা মরে গেছে। এই পৃথিবীতে আপনজন বলতে আমার কেউ নেই। সেদিন তুমি আমাকে না বাঁচালে আমি হয়তো মরেই যেতাম। তাই তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তুমিই আমার আপনজন। আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না। খুকির প্রতি টুকুর ভালোবাসা দেখে খুকি বেজায় খুশি হলো। সে অট্টহাসি দিয়ে দৌড়ে তার রুমে চলে গেল। টুকুও উড়ে চলল খুকির পিছন পিছন। এই দৃশ্য দেখে খুুকির মা-বাবা তৃপ্তির
হাসি হাসলেন।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top