দুপুর ১২:৫০, শুক্রবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ রাজনীতি / খালেদা জিয়ার ডাকের অপেক্ষায় সংস্কারপন্থীরা
খালেদা জিয়ার ডাকের অপেক্ষায় সংস্কারপন্থীরা
মার্চ ১৪, ২০১৭

রাজকুমার নন্দী : দীর্ঘ দশ বছর প্রতীক্ষার পর গত মাসে সংস্কারপন্থী দুই নেতার ভাগ্য ফেরায় এখন বাকি নেতারা বিএনপিতে ফিরতে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ডাকের অপেক্ষায় রয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেনের চরম দুর্দিনে বিএনপির পাশে থাকতে না পারায় এখন দারুণ অনুতপ্ত দলটির সাবেক এই নেতারা। অতীতের ভুল-ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে দলের পক্ষে এখন ভূমিকা রাখতে চান তারা। তাই মাতৃসম নেত্রীর কাছে মাফ চেয়ে বিএনপিতে ফিরতে তারা এখন মানসিক প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। তবে ধাপে ধাপে তাদের অধিকাংশকে দলে ফেরানো হবে। এবার ডাক পড়তে পারে বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিসহ আরও কয়েকজনের। খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তৃপ্তির বহিষ্কারাদেশও প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

সংস্কারপন্থী নেতাদের বিএনপিতে ফিরিয়ে নেয়ার পক্ষে দলটির রাজনীতির পরামর্শক ও সমালোচক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন আসছে। হাতে খুব বেশি সময় নেই। দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে অতীত ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করে দিয়ে খুব দ্রুতই সংস্কারপন্থিদের ফিরিয়ে নিয়ে বিএনপির এখনই মাঠে নামা উচিত।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনের আগে দলকে একটি প্লাটফর্মে দাঁড় করাতে চান খালেদা জিয়া। কারণ, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের দাবিতে প্রয়োজনে রাজপথেও নামতে চান বিএনপি প্রধান। এ কারণেই সাংগঠনিক ঐক্যের প্রতি জোর দিয়েছেন তিনি। তাই দলের বাইরে থাকা সংস্কারপন্থিদেরও কাছে টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বেগম জিয়া। এর অংশ হিসেবে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দলের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জহিরউদ্দিন স্বপন এবং সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে গুলশান কার্যালয়ে ডেকে পাঠান খালেদা জিয়া। অতীত কর্মকান্ডের জন্য ক্ষমা চাইলে বেগম জিয়া তাদের দলে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন।

এদিকে, স্বপন ও বকুল বিএনপিতে ফেরায় বাকি সংস্কারপন্থী নেতা ও তাদের অনুসারী কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে আশার আলোর সঞ্চার হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, অতীত কর্মকান্ড ক্ষমা করে দিয়ে খালেদা জিয়া তাদেরকেও দলে পুনরায় কাজ করার সুযোগ দিবেন। তবে সংস্কারপন্থী বাকি নেতারা যাতে বিএনপিতে ফিরতে না পারেন, সেজন্য তাদের দুই-একজনের বিরুদ্ধে দলীয় বিরোধিতাও হচ্ছে। তৃপ্তি যাতে দলে ফিরতে না পারেন, সেজন্য সম্প্রতি যশোর প্রেসক্লাবে তার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। তবে এর পেছনে দলের এক সিনিয়র কেন্দ্রীয় নেতার ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ তৃপ্তির কর্মী-সমর্থকদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংস্কারপন্থী অভিযোগে ২০০৭ সালে তৃপ্তিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও কর্মীবান্ধব ও জনপ্রিয় হওয়ায় তার নিজের এলাকা শার্শা থানা বিএনপির নেতাকর্মীরা তৃপ্তির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তৃপ্তি দীর্ঘদিনেও দলে ফিরতে না পারলেও হতাশ নন তারা। সম্প্রতি তৃপ্তির ঢাকার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, শার্শার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন থেকেই বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এসে তৃপ্তির সঙ্গে কথা বলছেন। তৃপ্তির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সেখানে উপস্থিত শার্শা বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, তৃপ্তি ভাই যাতে বিএনপিতে ফিরতে না পারেন, সেজন্য দলের এক সিনিয়র কেন্দ্রীয় নেতার ইন্ধনে ওই সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। যেখানে শার্শার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র একটি ইউনিয়নের হাতেগোনা দুই-চারজন নেতা উপস্থিত ছিলেন, যা সমগ্র থানা বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করে না। শার্শার অধিকাংশ নেতাকর্মী তৃপ্তি ভাইয়ের সঙ্গেই রয়েছেন। তারা মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে দলে স্বাগত জানাতে উদগ্রীব হয়ে আছেন। জানতে চাইলে মফিকুল হাসান তৃপ্তি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) আমাকে যেখানে যেভাবে সক্রিয় করবেন, সেখানে থেকেই কাজ করব। অনেক সুযোগ ও প্রলোভন এসেছে, আমি যাইনি। বিএনপিতে ছিলাম, বিএনপিতেই থাকতে চাই। শার্শার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। আমি সবাইকে নিয়েই কাজ করব।

ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সেনাসমর্থিত সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের জুনে ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়ে তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং তাকে সমর্থনকারী শতাধিক সাবেক এমপি ও সিনিয়র নেতা সংস্কারপন্থী বলে বিএনপিতে পরিচিতি পান। খালেদা জিয়া সে সময় মান্নান ভূঁইয়াসহ কয়েকজনকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। এরপর অবশ্য অনেককে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদেও বসানো হয়। বাকিরা ক্ষমা চেয়ে দলে ফিরতে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে বার্তা পাঠান। এ ধারা অব্যাহত থাকায় সংস্কারপন্থিদের দলে ফেরাতে ২০১৫ সালের দিকে বিএনপির কয়েকজন নেতাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেন। সর্বশেষ গত বছরের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তাদের ফিরিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনে খালেদা জিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়া নেতাকর্মীরা আপত্তি জানানোয় তাদের আর দলে ফেরা সম্ভব হয়নি। এতে কিছুটা অসন্তুষ্ট হলেও হাল ছাড়েননি তারা। কোনো পদ-পদবি না থাকলেও দলের পক্ষে নানা মাধ্যমে সোচ্চার ছিলেন। এমনকি তারা অন্য কোনো দলেও যাননি, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দশম সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেননি।

জানা যায়, সংস্কারপন্থি অভিযোগে এখনো প্রায় অর্ধশত সাবেক এমপি ও নেতা বিএনপির বাইরে রয়েছেন। দু-একজন বাদে দলের বাইরে থাকা সব নেতাকেই পর্যায়ক্রমে দলে নেওয়া হবে। সাংগঠনিক দায়িত্বও পাবেন কেউ কেউ। দলের বেশ কয়েকটি শূন্যপদসহ বিষয়ভিত্তিক উপ-কমিটিতেও এই নেতাদের জায়গা করে দেয়া হতে পারে। জনপ্রিয়তাভেদে এদের কয়েকজন আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও পেতে পারেন। বিএনপির কয়েকজন নেতা এ নিয়ে কাজও করে যাচ্ছেন। তবে এ ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি দলের হাইকমান্ড।

সংস্কারপন্থিদের দলে ফেরানোর উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন বিগত ওয়ান-ইলেভেনে খালেদা জিয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়া বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপিতে খ্যাতনামা সংস্কারপন্থী যারা ছিল তারা অনেক আগেই দলে ফিরেছে। তাহলে ছোটো-খাটোরা দলের বাইরে থাকবে কেন? সবাই তো একই অপরাধে অপরাধী। ম্যাডাম বড়দের ক্ষমা করতে পারলে ছোটদের কেন ক্ষমা করতে পারবেন না? তাই একজন-দু’জন করে নয়, বাকি সবাইকে একসঙ্গে ফিরিয়ে নিয়ে একই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া উচিত। এরপর তাদের কর্মকান্ড দেখে কাকে কোথায় কী অবস্থায় রাখা হবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

 

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top