সকাল ৯:৪১, বুধবার, ২৮শে জুন, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / কুটুম পাখি
কুটুম পাখি
এপ্রিল ২৯, ২০১৭

আহাদ আলী মোল্লা: গো ধরে বসে থাকে সোজি। সে কিচ্ছু খাবে না। এমনকি পানিটুকুও মুখে দেবে না আর। আগে পাখির মাংস সরাও। তারপর খাওয়ার কথা বলো। কাটতি কবুল। যে কথা সেই কাজ সোজির। দুপুর গড়িয়ে যায়। সবারই খিদে পেয়েছে। কিন্তু সোজিকে একা রেখে কিভাবে খাবে। সবাই চিন্তায় পড়ে যায়।

ওর নানু ভাইয়াতো রীতিমতো ঘাবরে যান। চিন্তারই বিষয়। হঠাৎ সোজির ছোট মামা ঢোকেন বাড়িতে। সবাইকে চুপচাপ দেখে কৌতূহল জাগে তার। তিনি প্রশ্ন করেন কী হয়েছে সবার মুড অফ যে? সোজির নানি মুখ খোলেন। সে আর বলিসনে। পাখির মাংস রান্না নিয়ে বাড়িতে তোলপাড় আজ। একটু খুলে বলো কী হয়েছে? জানতে চায় সোজির ছোট মামা।


সোজি ক্লাস ফোরে পড়ে। বার্ষিক পরীক্ষার পর স্কুল ছুটি। এরই মধ্যে বাসায় বেড়াতে আসেন ওর নানা। বায়না ধরে নানা বাড়িতে বেড়াতে যাবে। দু’দিন পরই চলে যায় নানাবাড়ি। চুয়াডাঙ্গা জেলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে গ্রামের নাম বাঘাডাঙ্গা। রাইসা বিল আর ভৈরব নদীর তীর ঘেঁষে গ্রামটি।

বিলের প্রশস্ত স্বচ্ছ জল আর ভৈরবের কূল কূল ¯্রােত খুব মন কাড়ে ওর। সকাল-বিকেল ভৈরবের ধারে গিয়ে খানিক দাঁড়িয়ে থাকে। কত পাখির আনাগোনা। কত রকম ডাক তাদের। বড় মামা এক ভাঁড় রস এনে সোজিকে ডাকে। কই এসো রস খাবে। টাটকা রস।


 এখনই গাছ থেকে খুলে নিয়ে আসলাম। সোজি লেপ মুড়ি দিয়ে বসে বসে একটা ছবি আঁকছিল। গ্রামীণ দৃশ্য। হঠাৎ মামার ডাক শুনে সে বাইরে বেরিয়ে এলো। মামা ওর হাতে এক গেলাস রস দিয়ে বললেন আরেক গেলাস খাবি মা। সোজি বললো নল দিয়ে খাবো। নল কোথায় পাবো? মামা হেসে জবাব দেয়। নানি রান্না ঘর থেকে সাড়া দিয়ে বললেন এই তো নল আমার কাছে।

 

তিনি একটি পাঠকাঠি ভেঙে নল বানিয়ে সোজিকে দিলেন। পাঠকাঠির নল দেখে ফিক করে হেসে ফেললো সে। তাই নিয়ে খুব হাসাহাসি চললো খানিক। পাঠকাঠির নল দিয়ে গেলাসের পুরো রস খেয়ে ফেললো সোজি। কিন্তু শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে সে। সাত সকালে ঠান্ডা রস খেলে একটু এমন হয় বললেন নানা। চল বাজার থেকে ঘুরে আসি।


 নানুর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে সোজি। গ্রামের পাশেই কার্পাসডাঙ্গা বাজার। এখানে এক সময় ইংরেজদের রাজত্ব ছিল। পড়ে আছে ভাঙাচোরা নীলকুঠি। হাঁটতে হাঁটতে দেখান নানু ভাই। সোজি হরেক রকম প্রশ্ন করে। নানু ভাই জবাব দেন। বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে কার্পাসডাঙ্গা বাজার ১০ মিনিটের পর। ছোট বাজার। সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে। আশপাশ গ্রামের সাধারণ মানুষ এখানে কেনাকাটা করে। বাজারে উঠতেই সোজির চোখে পড়লো অনেক পাখি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন। নানুর সঙ্গে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সোজি। হরেক কিছিমের পাখি।


এসব পাখি এর আগে কোনোদিন দেখেনি সে। কিচির মিচির করে ডাকছে পাখিগুলো। সব পাখির পা দড়ি দিয়ে বাঁধা। ডানা ঝাপটায় উড়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু পারে না। পাখিগুলো বড্ড অসহায়। সোজির খুব মায়া হয়। ওর নানা বড় বড় ঠ্যাংওয়ালা দুটো পাখি কিনে নেন।

এবার বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করেন। সোজি প্রশ্ন করে এ পাখির নাম কী নানু ভাই? ওর নানা নাম বলতে পারেন না। তিনি বলেন যেসব পাখি দেখলাম একটারও নাম জানিনে আমি। তবে এদের নাম অতিথি পাখি। অতিথি পাখি নাম হলো কেন? আবার প্রশ্ন করে সোজি।


 নানু উত্তর দেন? সে অনেক কথা। তাও বলো নানু ভাই। আগ্রহ আর কৌতূহলে ওর মুখটা যেন ফ্যাঁকাসে হয়ে ওঠে। নানু বলেন, শোন তাহলে। এসব পাখি হাজার হাজার মাইল দূরের দেশে থাকে। সেখানে এদের বসবাস। যখন শীতকাল আসে ওদের দেশ বরফে ঢেকে যায়। সেখানে থাকলে বরফে জমে ওরা মারা যাবে। তাই ওদের দেশ ছেড়ে আমাদের দেশে বেড়াতে আসে।

 শীত শেষে আবার ফিরে যায় নিজের দেশে। সামান্য কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশে বেড়াতে আসে বলে এদের নাম অতিথি বা কুটুম পাখি। তুই যেসব পাখি দেখলি, এগুলো আমাদের ওই রাইসা বিল থেকে ধরা। ওরা বিলে সারাদিন খেলা করে, রাতে ঘুমায়। তখন শিকারীরা ফাঁদ পেতে ওদের ধরে। পাখির মাংস খুব মজা। আজ তোকে নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াবো বলেই দুটো কিনলাম।


নানুর কথায় খুশি হতে পারে না সোজি। ওর খুব মায়া হয়। কষ্টে দু’চোখ ছলছল করে ওঠে। সে নানুকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা নানু ওরাতো আমাদের কুটুম। আমাদের আত্মীয়। ওদেরকে ধরে ধরে জবাই করে খাওয়া কি আত্মীয়দের কাজ? সোজির প্রশ্ন শুনে নানু হো হো করে হেসে ওঠেন।

শান্ত গলায় সোজি জানায়, না নানু ওদেরকে জবাই কোরো না। ছেড়ে দাও। কুটুম পাখির মাংস আমি খাবো না। কিন্তু সোজির কথায় কেউ আমল দেয় না। হেসেই উড়িয়ে দেয় সব কথা। ঝুড়েকুটে রান্না হয় অতিথি পাখি। সোজির বারণ কেউ শোনে না। ওর খুব মন খারাপ।

 সোফায় গো ধরে বসে থাকে সে। কিচ্ছুতেই ওই মাংস খাবে না সে। ছোট মামা সব শুনলেন। বললেন ঠিক। সোজির কথাই ঠিক। কুটুম পাখির মাংস আমিও খাবো না আর কোনো দিন। এখন থেকে আমিও এর বিরোধিতা করবো। প্রতিবাদ করবো। তিনি পুরো মাংস প্রতিবেশী দুই এতিম ভাই-বোনকে দিয়ে এলেন। এরপর ছোট মামা বললেন, আয় সোজি এবার সবাই একসাথে মাছভাত খাই। সোজি ফিক করে হেসে উঠলো।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top