দুপুর ১২:০৭, সোমবার, ১লা মে, ২০১৭ ইং
/ দেশজুড়ে / কিশোরগঞ্জের দুই যুদ্ধাপরাধীর প্রাণদণ্ড
কিশোরগঞ্জের দুই যুদ্ধাপরাধীর প্রাণদণ্ড
এপ্রিল ১৯, ২০১৭

একাত্তরে কিশোরগঞ্জ এলাকায় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণের মত মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে তখনকার রাজাকার বাহিনীর সদস্য মোসলেম প্রধান ও পলাতক সৈয়দ মো. হুসাইনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।

একাত্তরে কিশোরগঞ্জ এলাকায় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণের মত মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে তখনকার রাজাকার বাহিনীর সদস্য মোসলেম প্রধান ও পলাতক সৈয়দ মো. হুসাইনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।বিচারপতি আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বুধবার সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে এই রায় ঘোষণা করে।

রায়ে বলা হয়, প্রসিকিউশনের আনা ছয় অভিযোগের সবগুলোই প্রমাণিত হয়েছে। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আসামিদের সাজা কার্যকর করতে হবে।

সেই সঙ্গে পলাতক মো. হুসাইনকে গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। এ বিষয়ে প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতে বলা হয়েছে।

ছয় অভিযোগের মধ্যে তৃতীয় অভিযোগে নিকলীর গুরুই গ্রামে নির্বিচারে ২৬ জনকে হত্যার দায়ে সর্বসম্মতভাবে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।

চতুর্থ অভিযোগে নিকলীর নানশ্রী গ্রামে হিন্দু নারীদের ধর্ষণ ও হিন্দুদের আটকে রেখে নির্যাতনের পর ৩৪ জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আসামি হুসাইনের সর্বোচ্চ সাজার রায় এসেছে। একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নারীদের টার্গেট করে ব্যাপক হারে ধর্ষণের ঘটনাকে আদালত বিবেচনা করেছে গণহত্যার সমতুল্য অপরাধ হিসেবে।

পঞ্চম অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল মালেককে ধরে নিয়ে হত্যার ঘটনায় আসামি হুসাইন ও মোসলেমকে সর্বসম্মতভাবে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

এছাড়া আরও তিন অভিযোগে আসামি হুসাইনের মোট ২২ বছরের কারাদণ্ডের রায় এসেছে ট্রাইব্যুনালে।

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, দুই আসামি একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাদের মধ্যে হুসাইন নিকলি থানা এলাকায় ‘রাজাকার দারোগা’ হিসেবে এবং মোসলেম প্রধান নিকলি ইউনিয়নে রাজাকার কমান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তারা তখনকার কিশোরগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত ও যৌথভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন বলে এ মামলার বিচারে উঠে এসেছে।

হুসাইনের বড় ভাই সৈয়দ মো. হাসান ওরফে হাছেন আলীকেও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃতুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। ভাইয়ের মত হাছেন আলীও পলাতক।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, “রায়ে আমরা অত্যন্ত খুশি। সফল্ভাবে কাজ করতে পেরেছি। দুটো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, একটি আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিনটি অভিযোগে ২২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে।”

একটি দিক দিয়ে এ মামলায় ‘অসাধারণ সাফল্য’ এসেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এই রায়ে প্রথমবারের মত যুদ্ধকালীন ধর্ষণকে গণহত্যার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একাত্তরের গণধর্ষণকে আদালত ‘জেনোসাইডাল রেপ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, ওই চার্জে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুস সাত্তার পালোয়ান বলেন, “ট্রাইব্যুনাল ও আইনের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। মক্কেলের সঙ্গে পরামর্শ করে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের মামলায় রায়ের এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করা যায়। তবে পলাতক পলাতক সৈয়দ মো. হুসাইনকে সে সুযোগ নিতে হলে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত রায় আসা ২৮টি মামলার ৪৮ আসামির মধ্যে মোট ৩০ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার আদেশ হল।

সৈয়দ মো. হুসাইন ওরফে হোসেন

সৈয়দ মোসলেহ উদ্দিন ও সৈয়দা ফাতেমা বানুর ছেলে মো. হুসাইনের জন্ম ১৯৫১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।তার স্থায়ী ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাছিহাতা হলেও তার সর্বশেষ বর্তমান ঠিকানা ছিল ঢাকার খিলক্ষেতের পিংক সিটির ৬ নম্বর সড়কের ২ নম্বর বাড়ি। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কিশোরগঞ্জের হয়বতনগরে থাকতেন বলে প্রসিকিউশনের তথ্য।

হুসাইন কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে এসএসসি ও ১৯৭৫ সালে বিএ পাশ করেন।  মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মতাদর্শ গ্রহণ করেন।

ওই সময় নিকলি থানা এলাকায় ‘রাজাকার দারোগা’ হিসেবে পরিচিত হুসাইন কিশোরগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তিগত ও যৌথভাবে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ। তিনি ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃতুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সৈয়দ মো. হাসান ওরফে হাছেন আলীর ছোটভাই।

মো. মোসলেম প্রধান

১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের নিকলি থানার কামারহাটি গ্রামে মোসলেমের জন্ম। তার বাবা লাভু শেখ ও মা রেজিয়া আখতার। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই; তবে অক্ষরজ্ঞান আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নিকলি ইউনিয়নের রাজাকার কমান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং কিশোরগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তিগত ও যৌথভাবে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ।

মোসলেম পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top