সকাল ৯:৩৬, শুক্রবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / কিংবদন্তিতুল্য স্যামসন এইচ চৌধুরী
কিংবদন্তিতুল্য স্যামসন এইচ চৌধুরী
January 4th, 2017

 

 

 

 

 


আজ ৫ জানুয়ারি ছিল স্যামসন এইচ চৌধুরীর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। গত ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারী বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও স্কয়ার গ্রুপের কর্ণধার স্যামসন এইচ চৌধুরী ৮৬ বছর বয়সে তিনি মারা যান।


দেশের অন্যতম শীর্ষ এই শিল্পোদ্যোক্তা ১৯২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ভারত থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে পাবনার আতাইকুলা গ্রামে একটি ফার্মেসির দোকান দিয়ে তিনি তাঁর ব্যবসায়িক জীবন শুরু করেন। এ দোকানের অভিজ্ঞতা থেকে ১৯৫৮ সালে চার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে খুব স্বল্প পরিসরে শুরু করেন একটি ওষুধ কারখানা। সেই কারখানাই আজ পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল।

 
জন্ম ফরিদপুর হলেও তাঁর শিশুকাল কেটেছে চাঁদপুরে আর শৈশবে ময়মনসিংহ স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। কৈশোরে কলকাতার উপকন্ঠে বিষ্ণুপুর শিক্ষামঞ্চ উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন। সেখান থেকে সিনিয়র ক্যামব্রিজ ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের ওপর কোর্স করেন। যৌবনের প্রারম্ভে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধ শেষে কুমিল্লার অনিতা চৌধুরীকে জীবনসঙ্গি করে পাবনার আতাইকুলায় পিতৃভবনে স্থায়ী হন। দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তা এই অজাতশত্রু মানুষটি জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে আছেন।


শিল্প জগতের রেটিং এজেন্সি ‘ড্যান এবং ব্রডস্ট্রিট শিল্প খাতে তাঁকে প্রাইভেট সেক্টরে কোম্পানিগুলোর শীর্ষতম স্থান প্রদান করেছে। তিনি ছিলেন ঔষধ, টেক্সটাইল, কনজ্যুমার প্রোডাক্টসহ ২৫টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা। এছাড়া ব্যাংক, বীমা, মুদ্রণ, মিডিয়া- কী ছিল না তাঁর সাম্রাজ্যে। ‘জীবন বাঁচাতে এবং জীবন সাজাতে’ সবই ছিল তার স্কয়ার সাম্রাজ্যে।


তিনি একজন গৃহপতি ছিলেন। পারিবারিক শৃঙ্খলা ধরে রাখতে ‘পরিচ্ছন্নতা’ শব্দটিকে তিনি বারবার ব্যবহার করতেন। স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, পিতা-কন্যা, জীবনের বিভিন্ন অভিব্যক্তিতে তিনি শব্দটির যথার্থ ব্যবহার করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন প্রবল ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন। প্রাতঃকালীন প্রার্থনা না করে তিনি বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রাতরাশ গ্রহণ করতেন না। প্রাতঃকালীন প্রার্থনায় অনুপস্থিত হলে তাঁর নির্দেশ ছিল নো বাইবেল নো ব্রেকফাস্ট।


তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে অবহেলা করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, নীতিবোধ ও মূল্যবোধ একমাত্র ধর্মাচরণের মাধ্যমেই সম্ভব। স্কয়ারের সূচনা থেকেই তিনি দেশের ক্ষুদ্রতম খ্রিষ্টীয় সমাজের জন্য তাঁর মেধা ও সময় দিয়েছেন। ১৯৫৬ থেকে আমৃত্যু তিনি চার্চের মাধ্যমে খ্রিষ্টীয় সমাজ ও দেশের কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন। স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে তিনি দেশের  মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সমবায় নিয়ে ভেবেছেন।

 এ কাজে তাঁর প্রিয় সহকর্মি ছিলেন আমেরিকান ম্যারি মিলনায় ও জিম ওয়েকার এ সময় স্যামসন এইচ চৌধুরী বুঝেছিলেন, এ খাদ্য ও ওষুধ পাকিস্তানি বাহিনী নিজেরাই ব্যবহার করবে তাই তিনি ডব্লিউসিমিকে জানালেন, যেন এই শিপমেন্ট ভারতের শরণার্থী ক্যাম্পে পাঠানো হয়। যেই কথা সেই কাজ হয়েছিলও তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেছেন সুজানগরে তিনি প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন।


মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ গঠনের জন্য জার্মানির স্টুটগার্টে গিয়ে ডোনার কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশ ইকোমিনিক্যাল রিলিফ রিহ্যাবিলিটেশন সার্ভিস (বিইআরআরএস) গঠন করেন। পরবর্তীকালে খ্রিষ্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশ (সিসিডিবি) রূপ নেয়। সিসিডিবি আরিচা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও মহেশখালীর মৎস্যজীবীদের জাল, নৌকা, কোল্ডষ্টোর প্রদান, নরসিংদীতে তাঁতিদের পুনর্বাসন; রাজশাহীতে ১২ মিলিয়ন ডলারের কৃষি প্রকল্প, বাংলাদেশ সরকারকে দূরপাল্লার ওয়াকিটকি ও বার্জ প্রদান; বরিশাল ও গোপালগঞ্জে ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারের ইরি প্রকল্প তাঁর ঐক্যন্তিক উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে কৈননীয়া নামক এনজিওরও দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি- বর্তমানে তাঁর ছেলে তপন চৌধুরী এর চেয়ারম্যান।

 
তিনি ছিলেন ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’-এর সভাপতি। তিনি কখনোই কর্মচারিদের বঞ্চিত করেননি। তাঁর কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানে কখনো ধর্মঘট হয়নি। কর প্রদান সম্পর্কে তিনি যিশুর নির্দেশ অনুসরণ করতেন। তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম শীর্ষ করদাতা এবং কর ফাঁকিকে ঘৃণা করতেন। তিনি ঋণখেলাপি ছিলেন না, পুঁজিবাজারে নয়ছয় করেননি।


জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০০৭-০৮ সালে মি. চৌধুরীকে বাংলাদেশের সর্বাধিক করদাতাদের মধ্যে একজন হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। বহু বছর ধরে বাংলাদেশ সরকার তাকে কমার্শিয়াল ইমপরট্যান্ট পার্সন (সিআইপি) ও ভেরি ইমপরট্যান্ট পার্সন (ভিআইপি) এর মর্যাদা দিয়েছে। তিনি মেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্স ঢাকার সাবেক প্রেসিডেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আর ২০০০ সালে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েসন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ-এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েসন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট। সারা জীবনে তার সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেন।


 তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত বিজনেস এক্সিকিউটিভ অব দ্যা ইয়ার ১৯৯৮ এবং দ্য ডেইলি স্টার ও ডিএইচএল ওয়ার্ল্ড ওয়াইড এক্সপ্রেস লিমিটেড থেকে বিজনেসম্যান অব দ্য ইয়ার ২০০০। অনেকে বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা’র ভাবনাটি পাশ্চাত্য থেকে এসেছে। না, এটি পাশ্চাত্য দর্শন নয়, এটি স্যামসন এইচ চৌধুরীর দর্শন। ৩৩ হাজার সন্তানের (স্টাফ) লাঞ্চ ও লভ্যাংশ, ভাতা, বোনাস প্রদানÑ ভাবলে অবাক লাগে। কেন তিনি এ ফ্রি লাঞ্চ প্রথা চালু করেছেন? কেন তিনি স্টাফদের নিজের সন্তান হিসেবে বিবেচনা করতেন।


স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন অজাতশত্রু অসাধারণ সৌজন্যবোধ ও অমায়িক ব্যবহারের জন্য তাঁর খ্যাতি ছিল। সত্য কথনে তিনি অবিচল কিন্তু তাতে কেউ আহত হয়নি। তাঁর পোশাক পরিচ্ছদ যেমন আকর্ষনীয় ও দৃষ্টিনন্দন ছিল, তেমনি তাঁর চলন বলন ও কথন ছিল ঈর্ষনীয়। তিনি ছিলেন দানশীল কত ছাত্র-কতদরিদ্র; অনাথ কত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার তাঁর নীরব দানে সঞ্জীবিত হয়েছে দান করার ক্ষেত্রে তিনি যিশুর আদেশ কঠোরভাবে অনুশীলন করতেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে একটি গরিব ছাত্রকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন।


তিনি ভালোবাসতেন ভ্রমণ করতে। তিনি ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বহু দেশে ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই কৃতি মানুষটির স্মৃতির প্রতি জানাই শ্রদ্ধার্ঘ্য।
লেখক ঃ চিকিৎসক-মিডিয়া ব্যক্তিত্ব



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top