সকাল ১০:২৭, সোমবার, ১লা মে, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / এ দায় কার
এ দায় কার
ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬

এ দায় কার? আর এই দায়িত্বই বা কে নেবে? যে পিতা তার অবুঝ অসুস্থ সন্তানকে সুস্থ করার জন্য তার সাধ্য ও সামর্থ্যরে সব কিছু দিয়ে ওষুধ কিনে সন্তানের মুখে তুলে দিয়েছে। আবার সেই ওষুধ অসুস্থকে সুস্থ না করে, উল্টো আরও জীবন কেড়ে নিয়েছে।

 এই নিষ্পাপ জীবন যে ওষুধের কারণে নিভে গেল তার দায়িত্ব কার? যে পিতারা নিজের অজান্তে তার নিজ সন্তানকে ওষুধরূপি বিষ খাইয়েছে তাদের কে সান্ত¡না দেবে? যে মা তার চোখের সামনে পরম আদরের ধনকে তিলে তিলে মরতে দেখেছে তার কষ্টের সমব্যথি কে হবে?

মানুষের জন্মই হয় মৃত্যুর জন্য। আমরা মানুষরা কত ভাবেই না মারা যাই। ঘরে স্বাভাবিক মৃত্যু, রোগ শোকে মৃত্যু, বাইরে সড়ক দুর্ঘটনায়, প্রতিপক্ষের আঘাতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা পানিতে ডুবে। বিভিন্ন ভাবেইতো আমাদের জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন মানুষই জানতে পারে না তার মৃত্যু কিভাবে হবে? যার যে ভাবেই মৃত্যু হোক, জীবন যেহেতু একটাই তাই মারা গেলে জীবন আর ফিরে আসেনা।

 মানুষের নানাবিধ মৃত্যুর কারণের মধ্যে বাংলাদেশে মানুষ মৃত্যুর বিচিত্র কিছু কারণ আছে। এদেশে আমরা মানুষরা কেন জানি বড়ই অদ্ভূতভাবে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিই। বড়ই বিচিত্র এই বাংলার জমিন। মৃত্যুর উপর মানুষের কোন হাত নেই। তবে আমরা বাঙালিরা মানুষের মৃত্যুর খুব সহজ উপায় তৈরি করে দেই, যাতে করে বেঁচে থাক মানুষের জন্য কঠিন হয়ে যায়। নিজের জীবনকে সহজ ও জৌলুসপূর্ণ করতে আমরা অবলীলায় অন্যকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিই। ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ এটা মনে হয় এই বঙ্গ ভান্ডারেরই নিজস্ব সম্পদ।

 নিজেকে ভালো রাখতে অন্যের জীবন প্রাণ নিয়ে নোংরা খেলা খেলতে আমাদের কোন দ্বিধাই হয়না। মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তি এখন আরও প্রকট হয়েছে। নিজেকে ছাড়া অন্যকে মানুষ ভাবতে ইচ্ছেই করেনা। করেনা বলেইতো রানা প্লাজার মত বহুতল ভবন তৈরি হয়। বিশ্বজিতের মৃত্যুতে চুপ থাকে মানবতা বিশ্বাসীদের বিবেক। সাগর-রুনি, তনু, মিতুর আসমানি মৃত্যু হয়। ‘গুম’ শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে বাংলার শব্দ ভান্ডারে।
যখন পরিবার ছিলনা, গোত্র ছিলনা; ছিলনা রাষ্ট্র ব্যবস্থা, তখন কারো প্রতি কারো দায় ছিলনা।

কিন্তু যখন পরিবার হয়েছে, গোত্র থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে, তখন পরিবার দায়িত্ব পালন করেছে তার সদস্যদের। গোত্র প্রধানরা দায়িত্ব নিয়েছে, আর এখন রাষ্ট্র তার সকল নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তার বিধান করছে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রই নাগরিকের জীবন নিচ্ছে বা রাষ্ট্র ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিতরা নিজেদের বিত্ত বৈভব বৃদ্ধির জন্য সাধারণ নাগরিকের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয়, তখন চরম সত্য মৃত্যুর চেয়ে রাষ্ট্রকে, রাষ্ট্রের সেবকদেরকে বেশি নিষ্ঠুর ও নির্মম মনে হয়।

আজ থেকে ২৪০০ বছর আগে যখন ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। মানব শরীর তার স্বাভাবিক সামর্থ্য হারালে তাকে ওষুধ জাতীয় কিছু দিয়ে সুস্থ করে আগের অবস্থায় নিয়ে আসা সম্ভব এটা কেউ বিশ্বাস করতো না। কেউ অসুস্থ হলে মনে করা হতো এটা দেব দেবীর অভিশাপের ফল। চিকিৎসা ছাড়া কেউ স্বাভাবিক হলে সেটাকে দেব দেবীর আশির্বাদ মনে করা হতো। ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বে গ্রীসে জন্ম নেন হেপোক্রেটিস। তিনিই প্রথম মানব শরীরের অসুস্থতা ও রোগ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ওষুধ আবিষ্কার করেন। তারই পথ ধরে রোগ নিয়ে মানুষের ঐশ্বরিক ধারণা পরিবর্তন হতে থাকে।

 ওষুধের এই অগ্রগতির গল্পে আধুনিক ওষুধের জনক সে সময়ের পশ্চিম কানাডার নাগরিক স্যার উইলিয়াম ওসলার। এতদিনে অবশ্য ওষুধ নিয়ে বাঙালির ধারণাও বদলে গেছে। এ দেশের ওষুধ বিশ্বের ১২০ টি দেশে রপ্তানি হয়। দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আয় এই শিল্প থেকে। দেশে ওষুধের চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ হচ্ছে দেশিয় উৎস থেকে। তেমনি এদেশে উৎপাদিত নকল, ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধের কারণে মানুষের মৃত্যুও ঘটছে। অথচ এদেশে ওষুধ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়াদি দেখভালের জন্য ওষুধ প্রশাসন নামে একটি দপ্তর আছে।

 তারাই মূলত দেশের ওষুধ সংক্রান্ত সবকিছু দেখে থাকেন। আজ তাদের দেখার দৃষ্টি এতটাই সংকুচিত যে, রোগ ও ওষুধ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ যে ওষুধ সেবন করছে, এখন সেই ওষুধ মানুষের জীবন ধীরে ধীরে মরণের পথে নিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার মিটফোর্ড রোডের দোকানগুলোতে সব ধরনের ওষুধের কাঁচামাল পাওয়া যায়। কোন কোম্পানি কতটা ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করে, কি পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে ওষুধ তৈরি করে, আর কতটা চোরাই বাজারে বিক্রি করে এর কোন হিসেব এই অন্ধ ওষুধ প্রশাসনের কাছে নেই।

 এমনকি কোম্পানির নামে কাঁচামাল আমদানি করে, সেই কাঁচামালে ওষুধ তৈরি না করে অন্য কোন কোম্পানির কাছে তা বিক্রি পর্যন্ত করে দেয়। আবার কোন কোন কোম্পানি কাঁচামাল আমদানি করে চোরা পথে বিক্রি করে দিয়ে নিজেরা ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধ তৈরি করে। ওষুধ প্রশাসনের লাইসেন্স বিহীন বা লাইসেন্স নবায়ন ছাড়া লাল কালির অনেক কোম্পানি আজও তাদের উৎপাদন ও বিক্রয় কার্যক্রম অবলীলাক্রমে চালিয়ে যাচ্ছে। ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছে ওষুধ প্রশাসন। ওষুধ প্রশাসনে অ্যালোপ্যাথিক মোট ২৬৬ কোম্পানির লাইসেন্স আছে। এরমধ্যে চালু আছে ২২০ টি কোম্পানি। আর ৪২ টি কোম্পানি মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স নিয়ে উৎপাদন চালিয়ে
যাচ্ছে। তাছাড়াও আদালতের নির্দেশে বেশ কয়েকটি কোম্পানির ওষুধ উৎপাদন ও কিছু ব্রান্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সব কিছুই ঘটছে ওষুধ প্রশাসনের গাফলতির কারণে।

সম্প্রতি ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ পানে ২৮ শিশুর মৃত্যুর অভিযোগে করা মামলার তদন্তে ওষুধ প্রশাসনের অবহেলার কারণে অভিযুক্ত রিড ফার্মার সব আসামিই খালাস পেয়েছে। সাত বছর আগে এই মামলা দায়ের করা হয়। এর আগে একই ধরনের অভিযোগে আরেকটি মামলা থেকে সব আসামিরা খালাস পায়। সঠিক তথ্য প্রমাণের অভাবে আদালত আসামিদের খালাস দিয়েছেন। আইন শৃঙ্খলার প্রতি এদেশের মানুষের আস্থা এখন তলানিতে। তদুপরি আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণে কথা উঠেছে, মামলার বাদি ও তদন্ত কর্মকর্তার পেশ করা তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে।

 ওই কর্মকর্তা সঠিক নিয়ম মেনে জব্দ করা ওষুধের তালিকা ও পরিক্ষা প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেননি। উল্টো তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, রিড ফার্মার প্যারাসিটামলে বিষাক্ত ডাই ইথিলিন গ্লাইকল পাওয়া যায়নি। আদালত তার রায়ে বলেছে, তদন্ত কর্মকর্তার অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। ঢাকা শিশু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসক ডা. মোঃ হানিফ রিড ফার্মার ওষুধ খেয়ে শিশু মৃত্যু হচ্ছে-এমন ঘটনা তিনিই প্রথম কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন। অথচ খুবই স্পর্শকাতর এই মামলায় তাকেই সাক্ষি করা হয়নি।

 এটা কার স্বার্থে? এটাও অদক্ষতা? এ অযোগ্যতা কাদের সুবিধার্থে। মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণেও এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। মামলার আলমত জব্দে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, এমনকি তা আদালতে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। রায় ঘোষণার পূর্বে আদালত তার পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করে বলেন, বাদি ও তদন্ত কর্মকর্তা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম সঠিক নিয়ম মেনে জব্দ তালিকা ও পরিক্ষা প্রতিবেদন আদালতে জমা দেননি। মামলা দায়েরের সময় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল, তা নেয়ায় তার অযোগ্যতা ও অদক্ষতা প্রমাণিত হয়।

 এই পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, নিয়ম হচ্ছে জব্দ করা আলামত চার ভাগ করতে হবে। এক ভাগ আদালতে, এক ভাগ আসামির কাছে, এক ভাগ ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে এবং এক ভাগ ড্রাগ প্রশাসনে পাঠাতে হবে। জব্দ আলামত আদালতে উপস্থাপিত হয়নি। চিকিৎসক যে ব্যাচের সিরাপ ওষুধ প্রশাসনকে দিয়েছেন ওই ব্যাচের ওষুধ পরিক্ষার জন্য না পাঠিয়ে, অন্য ব্যাচের ওষুধ ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। অথচ সাত বছর আগে করা মামলায় বলা হয়, রিড ফার্মার তৈরি প্যারাসিটামলে বিষাক্ত উপাদান রয়েছে এবং এই বিষাক্ত উপাদানের কারণেই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জমা করা অভিযোগপত্রে বলেছেন, ওই প্যারাসিটামলে বিষাক্ত উপাদান পাওয়া যায়নি। তবে ওই ওষুধ নি¤œমানের ছিল।

মামলার পর্যবেক্ষণে আদালত যে কথাগুলো বলেছেন তাতে বোঝা যায়, তথ্য প্রমান উপস্থাপন না করে তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের খালাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর এটা যে এমনি এমনি হয়নি তা বোঝার জন্য কাউকে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হলো, বিনিময়ের ধরন রকম কেমন ছিল? এই রকম ব্যক্তিবর্গের কোন পরিবার পরিজন কিংবা আপনজন নেই। এরা কোন দিন অসুস্থ হবেন না, হলেও এরা এদেশিয় ওষুধ খাবেন না। বিমানে বা জাহাজে করে এদের জন্য উচ্চমানের ওষুধ ভিন দেশ থেকে আনা হবে। কিংবা কোন ঝামেলায় পড়ে কোন দিনও আইন আদালতের শরণাপন্ন হবেন না।

 যে ২৮ শিশুর পিতা-মাতার নিঃশব্দ হাহাকার এদের বিবেককে জাগাতে পারেনি, এদের প্রতিধিক্কার। মীর জাফরদের কারণে বাংলার পতন হয়েছিল আর শফিকুলদের কারণে মানবতায় পচন ধরছে।
১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত ভেজাল ও নকল প্যারাসিটামলে আড়াই হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে, এখনও হচ্ছে। মনে হয় ওষুধ প্রশাসন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এটি জিম্মি হয়ে আছে ওষুধ কোম্পানির মালিকদের সিন্ডিকেটের কাছে। এ অবস্থার উন্নতি না ঘটলে বছরে বছরে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হবে। ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতের দায়ে বাংলাদেশ ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৯২-এর ১৬(সি) ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদন্ড বিধান রয়েছে। এ বিধান পরিবর্তন জরুরি। জীবন বাঁচানো ওষুধের মধ্যে ভেজাল মিশিয়ে কাউকে হত্যা করলে তার শাস্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদন্ড হতে পারে না।

 ওষুধ প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো আজ সময়ের দাবি। এইসব দুর্নীতিপরায়ণ লোকবল পুরো সমাজ ও মানবতাকে ধ্বংস করছে। এদের অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে এরকম গর্হিত কাজ বন্ধ করতে। মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে ওষুধ প্রশাসনের উদাসিনতা। দুর্নীতি কখনও অযোগ্যতা হতে পারেনা। অপরাধ কখনও অদক্ষতা নয়। শুধু ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া বা বিচারের প্রতিশ্রুতি নয়। সাধারণ মানুষ আজ এসব দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে মুক্তি চায়।
লেখক ঃ সাংবাদিক – প্রাবন্ধিক
ংযধড়হি০৭৭@মসধরষ.পড়স
০১৭১৬-২২৪৮১০



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top