ভোর ৫:৪৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ই আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ জাতীয় / এসো হে বৈশাখ, স্বাগত ১৪২৪
এসো হে বৈশাখ, স্বাগত ১৪২৪
এপ্রিল ১৩, ২০১৭

সৈয়দ আহমেদ অটল : ‘ওই নূতনের কেতন ওড়ে/ কালবৈশাখীর ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’ আজকের দিনে এই জয়ধ্বনি দিয়েই কেবল অশুভ শক্তিকে পরাভূত করা সম্ভব। কালবৈশাখীর ঝড় দিয়েই ‘মুছে যাক গ্ল¬ানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ তবেই সত্য, সুন্দর, মানবতাবোধ ও সামাজিক মুক্তি আসতে পারে। গড়ে উঠতে পারে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। মানুষে মানুষে গড়ে উঠতে পারে ভালোবাস আর প্রীতির বন্ধন। আজ পহেলা বৈশাখ। শুভ নববর্ষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। নারী আর পুরুষের মিলিত কন্ঠে আজ ছড়িয়ে যাবে সেই চিরচেনা সুর, চির আহবান- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।

জীর্ণ-পুরাতনকে পিছনে ফেলে নতুনকে স্বাগত জানাবার দিন আজ। আজ জয় করবার দিন, বিজয়ী হবার দিন। জয়ধ্বনি করবার দিন।
পহেলা বৈশাখ কেবলই একটি নতুন বছরের শুরুর দিন নয়। নতুন করে যাত্রা শুরুতে যে আনন্দ-উৎসব আয়োজিত হয়, সেটাই বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে ঐতিহ্য বাঙালির হাজার বছরের। যে উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সুতায় গেঁথে আছে অনাদিকাল থেকে। যেখানে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই। নেই অপসংস্কৃতির। সমাজের সকল প্রকার অশুভ শক্তিকে পরাভূত করবার নতুন শক্তি অর্জনের দিন আজ। বলা হয়, বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাস বা লোকজ ঐতিহ্য ও গৌরব পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পেয়েছে এই পহেলা বৈশাখে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির এক অপার শক্তি। পহেলা বৈশাখের মূল বাণী – উৎসবের মধ্যদিয়ে আনন্দ প্রকাশ। যে উৎসব হবে সার্বজনীন। যে উৎসবে আজ বাঙালি জাতি মেতে উঠবে দেশময়। বাংলাদেশ হবে সব মানুষের। সব ধর্মের, সব শ্রেণি-পেশার। হয অপশক্তিকে পেছনে ফেলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রেরনায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ তথা অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারন করে এগিয়ে যেতে হবে। বাঙালির এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্যেই নিহিত আছে মূল শক্তি। সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়েই অশুভ শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব। পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে আজ সূর্যোদয়ের সাথে সাথে যাত্রা শুরু করেছে ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বাঙালি জাতি নতুন প্রেরণায় পা ফেলবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে, আজকের দিনে এই কামনা।  

ষোড়শ শতকে সম্রাট আকবর ‘ফসলী সন’ প্রবর্তনের মাধ্যমে যে বাংলা সাল চালু করেছিলেন সময়ের বিবর্তনে সেই দিনটি এখন বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। আকবরের নবরতœসভার আমির ফতেহ উল্ল¬াহ সিরাজি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য হিজরি চান্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষের সঙ্গে মিলিয়ে ফসলী সালের গণনা শুরু করেন। তিনিই হিজরিকে বাংলা সালের সঙ্গে সমন্বয় করে বৈশাখ থেকে বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেছিলেন। বৈশাখ নামটি নেওয়া হয়েছিল নক্ষত্র বিশাখা  থেকে। পহেলা বৈশাখে আকবর মিলিত হতেন প্রজাদের সঙ্গে। সবার শুভ কামনা করে চারদিকে বিতরণ হতো মিষ্টি। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে বর্ষবরণ উৎসব চলে আসে জমিদার বাড়ির আঙিনায়। খাজনা আদায়ের মতো একটি রসহীন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় গান বাজনা, মেলা আর হালখাতার অনুষ্ঠান। আজ আর খাজনা আদায়  নেই, কিন্তু রয়ে গেছে উৎসবের সেই আমেজ। সেটা এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহর বন্দর আর গ্রামে, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালির মাঝে। খাজনা ও ফসল তোলার সন-তারিখের সুবিধার্থে বাংলা সনের যে প্রবর্তন আমরা দেখতে পাই, সে কারণেই পহেলা বৈশাখ ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ করেন। দেশ জুড়ে বসবে বৈশাখী মেলা।

ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান
এবারের ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানের ৫০ বছর বছর পূর্তি হচ্ছে। পহেলা বৈশাখ রমনা বটমূলে এবারের আয়োজনে সুরে সুরে বলা হবে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির কথা। এ আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ‘আনন্দ, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান ও অসাম্প্রদায়িকতা’। অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল ৬টা ১০ মিনিটে। সরোদিয়া রাজরূপা চৌধুরীর সরোদের সুরে ভোরের রাগালাপে শুরু হবে অনুষ্ঠান। গাওয়া হবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ ও রজনীকান্ত সেনের গান। সে সঙ্গে মানবিকতার আবাহনে গীত হবে বাউলসাধক লালন সাঁইয়ের গান। ছায়ানটের শিল্পী-শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শিল্পীদের কণ্ঠে পরিবেশিত হবে দশটি সম্মেলক গান। একক কণ্ঠে গাওয়া হবে ১৪টি গান। সব মিলিয়ে পরিবেশনায় অংশ নেবেন ১৬০ শিল্পী। ১৯৬৭ সালের প্রথম বর্ষবরণে সম্মেলক কণ্ঠে গীত হয়েছিল ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও’। এবারও সে গানটি থাকছে। সম্মেলক ও একক কণ্ঠে গাওয়া হবে ‘আননধ্বনি জাগাও গগনে’, ‘ওরে বিষম দরিয়ার ঢেউ’, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, ‘ভোরের হাওয়ায় এলে ঘুম ভাঙাতে’, ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল¬ী জননী’ ও ‘উদয় শিখরে জাগে মাভৈ মাভৈ’সহ নানা গান। একক কণ্ঠে গান শোনাবেন চন্দনা মজুমদার, খায়রুল আনাম শাকিল, মিতা হক, ইফ্্ফাত আরা দেওয়ান, মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি প্রমুখ। থাকবে কবিতা আবৃত্তিও। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শেষে শুভেচ্ছা কথনে অংশ নেবেন ছায়ানট সভাপতি ড. সন্জীদা খাতুন। তার শুভেচ্ছা কথন শেষে কিছুটা বিরতি দিয়ে শুরু হবে বর্ষবরণের পঞ্চাশ বছর পূর্তির বিশেষ আয়োজন পালা গান ‘দেওয়ানা মদিনা’। পরিবেশন করবেন নেত্রকোনার দিলু বাউল ও তার দল। এবারও রমনা বটমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অনন্য অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। এ ছাড়া অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখা যাবে ছায়ানটের ওয়েবসাইটে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা
পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ বা অপরিমেয় সংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। গত বছরের ৩০ নভেম্বর ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় ইউনেস্কোর ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের (আইসিএইচ) আন্তঃদেশীয় কমিটির একাদশ বৈঠকে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার আয়োজিত এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পঙক্তি ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এছাড়া সঙ্গীত বিভাগের উদ্যোগে কলাভবনের বটতলায় সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে সঙ্গীতানুষ্ঠান। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট পয়লা বৈশাখের দিন বিকাল ৪টায় রাজধানীর মিরপুর, দনিয়া রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে একক ও দলীয় লোকসঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তিসহ নানা আয়োজন পরিবেশন করবে। এছাড়া রাজধানী জুড়ে অনুষ্ঠিত হবে বৈশাখী মেলা।

 

 

 

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top