রাত ৪:২৩, শুক্রবার, ২২শে জুন, ২০১৭ ইং
/ Top News / এমপি লিটনের মরদেহ হেলিকপ্টারে ঢাকায় সুন্দরগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত উপজেলা ও জেলা শহরে বিােভ হত্যাকান্ডে আটক ১৮
এমপি লিটনের মরদেহ হেলিকপ্টারে ঢাকায় সুন্দরগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত উপজেলা ও জেলা শহরে বিােভ হত্যাকান্ডে আটক ১৮
জানুয়ারি ১, ২০১৭


গাইবান্ধা জেলা, মহিমাগঞ্জ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) ও রংপুর প্রতিনিধি : গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে সুন্দরগঞ্জ পৌর এলাকায় গতকাল রোববার সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের ডাকা এ হরতাল চলাকালে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এছাড়া গাইবান্ধা জেলা শহরেও জেলা যুবলীগের উদ্যোগে একটি বিােভ মিছিল বের করা হয়।

গাইবান্ধার-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে কিছু সংখ্যক দুর্বৃত্ত সর্বানন্দ ইউনিয়নের উত্তর সাহাবাজ গ্রামের (মাস্টারপাড়াস্থ) নিজ বাড়িতে ঢুকে গুলি করে হত্যা করার প্রতিবাদে গতকাল রোববার সকাল ৬টা থেকে দিনব্যাপী হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। এছাড়া তারা কালোব্যাজ ধারণ করে পথসভা করে। পৌর আওয়ামী লীগের ডাকে একদিনের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে উপজেলার সর্বত্র হাট-বাজারের দোকান-পাট, মিল-কারখানা, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা বন্ধ ছিল। সর্বত্রই কালো পতাকা ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে শোক পালন করছেন নেতাকর্মীরা। হরতাল চলাকালে কোন প্রকার যানবাহন এমনকি দুরপাল্লার কোন পরিবহন ছেড়ে যায়নি। আওয়ামী লীগ ও বিক্ষুব্ধ জনতা সকালে বামনডাঙ্গা রেলস্টেশনে লালমনিরহাট থেকে ছেড়ে আসা সান্তাহারগামী লোকাল ট্রেনটি আটক করে রেলযোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। স্টেশনস্টার হাইউল মিয়া জানান, লালমনিরহাট-সান্তাহারগামী ২০নং বগুড়া মেইল ট্রেনটি ৭.৫৫ মিনিটে বামনডাঙ্গা স্টেশনে পৌঁছে। এসময় এমপি লিটনের খুনিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে বিক্ষুব্ধ জনতা মিছিলসহ এসে ট্রেনটি আটকে দেয়। সাড়ে তিনটার দিকে ট্রেন অবরোধ প্রত্যাহার করলে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এছাড়া বামনডাঙ্গা ভায়া নলডাঙ্গা-ধোপাডাঙ্গা, ডোমেরহাট-গাইবান্ধা সড়কের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় গাছ ফেলে দিয়ে সড়ক অবরোধ করা। উপজেলার সর্বত্রই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি  টহল অব্যাহত রয়েছে।
]
যেভাবে গুলি করে এমপিকে হত্যা করা হলো :  এমপি লিটনের বাড়ির সামনে ক্রিকেট খেলারত সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সাইফুল ইসলাম জানায়, দুটি মোটরসাইকেল যোগে আগত ৫ জন বহিরাগত যুবক এমপি লিটনের সাথে দেখার করার অজুহাতে বিকাল ৪টা থেকে তার বাড়ির বাহির উঠানে ৩ জন ও সামনের রেল লাইন দিয়ে ২ জন ঘোরাফেরা করছিল। কিন্তু তাদের খেলা চলাকালে যুবকরা এমপি লিটনের সাথে দেখা করার জন্য কাল পেণ করতে থাকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ওই যুবকরা ক্রিকেট খেলে খেলা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য কিশোরদের শাসায়। কিন্তু কিশোররা খেলা অব্যাহত রাখার এক পর্যায়ে দেখতে পায় রেল লাইনে অবস্থানরত ওই দু-যুবক মোবাইল ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছিল। কথা বলা শেষে যুবকদ্বয় এমপি লিটনের বাড়ির উঠানে অবস্থান নিলে পূর্ব থেকে উঠানে অবস্থানরত ৩ যুবক এমপির সাথে কথা বলার ছলে তার অতিথি কে ঢুকে আকস্মিকভাবে এমপিকে ল্য করে পরপর ৫ রাউন্ড গুলি ছুড়ে দ্রুত মোটরসাইকেল যোগে পালিয়ে যায়। এমপির বাড়ির সামনে দিয়ে চলমান রেললাইনে কর্মরত শ্রমিক মাহির ও আনারুল ইসলাম জানান, গুলির শব্দ পেয়ে তারা ভীত হয়ে পড়েন। এসময় এমপির বাড়ি থেকে বাইর হয়ে এক মোটরসাইকেলে মুখোশধারী ৩ যুবককে তারা পালিয়ে যেতে দেখেন। মুখোশধারীদের কোমরে পিস্তল ঝুলানো ছিল বলে তারা দেখেছে। গুলির শব্দ পেয়ে কাজের লোক ইউসুফ আলী ও এমপির সহধর্মিণী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতি দৌড়ে অতিথি কে গিয়ে এমপিকে গুলিবিদ্ধ ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় এমপিকে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এমপি লিটনের মৃত্যু হয়।
এদিকে গত শনিবার রাতেই পুলিশের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, গাইবান্ধার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলামসহ প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনার পর থেকে এমপি লিটনের বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করে অতিথি কটি  কর্ডন করে রাখা হয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনী : সুন্দরগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ আতিয়ার রহমান জানান, মাননীয় এমপি মহোদয় দৃবৃর্ত্তদের গুলিতে নিহত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ তৎপর রয়েছে। শনিবার রাতে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি যৌথ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে হত্যাকান্ডের সাথে  জড়িত থাকার সন্দেহে ১৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। আটককৃতদের কয়েকটি গোয়েন্দা টিম জিজ্ঞাসাবাদ করছে বিধায় এই মহূর্তে তাদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না বলে ওসি জানান। ৩ প্লাটুন বিজিবিসসহ র‌্যাব, পুলিশ সার্বক্ষণিক টহলরত রয়েছে।  

সুন্দরগঞ্জ ও বামনডাঙ্গা শোকের জনপদ : এমপিকে হত্যার ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ ও বামনডাঙ্গা এখন শোকের ও প্রতিবাদের জনপদে পরিণত হয়েছে। চেয়ারম্যান এসোসিয়েশন দহবন্দ ইউপি কার্যালয়ে গতকাল রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তির দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক তারাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লেবু। সম্মেলনে সোমবার সকল ইউপি কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন ও মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তারা মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনাসহ শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
মেম্বার এসোসিয়েশন : উপজেলা মেম্বার এসোসিয়েশন তাদের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমপির হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এছাড়া কালো ব্যাচ ধারণ ও কালো পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এসময় বক্তব্য রাখেন মেম্বার এসোসিয়েশনের সভাপতি রেজাউল করিম ফুল বাবু, উপদেষ্টা সাদেকুল ইসলাম দুলাল, বিদ্যুৎ কুমার দেবশর্মা, আনারুল হক।

রংপুর : দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ আসনের এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটনের লাশ রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে নামাজে জানাজা শেষে গতকাল রোববার দুপুর আড়াইটায় হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর আগে দুপুর ১২ টা ৪৫ মিনিটে তার নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. অনিমেষ মজুমদার জানান, এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটনের ময়নাতদন্তে ফুসফুস, লিভার ও পেটে জমাটবাঁধা রক্ত পেয়েছে ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা। বুকের ভিতর থেকে বের করা হয়েছে একটি গুলি। এছাড়া বুকে ও হাতে ৫টি গুলির চিহ্ন রয়েছে।

গতকাল সকাল ৯টায় রংপুর মেডিক্যোল কলেজ হাসপাতালের হিমঘর থেকে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় মর্গে। সেখানে রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. নারায়ণ চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে ডা. খায়রুল ইসলাম ও ডা. রেজাউল করিম তার ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কলেজের অধ্যক্ষ ডা. অনিমেষ মজুমদার জানান, এমপি লিটনের বুকে তিনটি এবং হাতে দুইটি গুলি করা হয়েছিল। বুকে সামনের দিক থেকে দুইটি এবং পেছন দিক থেকে একটি গুলি করা হয়। তার শরীর থেকে একটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। তার ফুসফুস লিভার, পেটে প্রচুর পরিমাণ জমাটবাঁধা রক্ত পাওয়া গেছে।
সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লিটনের মরদেহ কড়া পুলিশ প্রহরায় নিয়ে যাওয়া হয় গোসল করানোর জন্য। সেখান থেকে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে তার মরদেহ আনা হয় পুলিশ লাইন স্কুল কলেজমাঠে। সেখানে প্রথমে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, এসপি মিজানুর রহমানসহ পুলিশ সদস্যরা। তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন পুলিশ লাইন জামে মসজিদের খতিব মাওলানা খন্দকার মোসাব্বিরুল ইসলাম।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাম্মেল হক, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন, রংপুর সিটি মেয়র সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টু, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন, সেক্রেটারী রেজাউল করিম রাজু, মহানগর সভাপতি তুষারকান্তি মন্ডল, সুন্দরগঞ্জ পৌর মেয়র আব্দুল্লাহ আল মামুন, রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, রংপুরের জেলা প্রশাসক এসপি মিজানুর রহমান, কোতোয়ালি থানার ওসি জাহিদুল ইসলামসহ পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তা এবং গাইবান্ধা, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর কয়েকশ’ নেতাকর্মী।

নামাজে জানাজার আগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাম্মেল হক এমপি বলেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এই হত্যাকা›ডটি পরিকল্পিত। তাকে তারাই হত্যা করেছে যারা ৭১ এ এদেশে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ধর্মের নামে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে তারা এই হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছে। প্রয়াত লিটন সুন্দরগঞ্জে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সে কারণে তিনি তাদের টার্গেটে ছিলেন। তারাই তাকে হত্যা করেছে।
এদিকে লিটনের মরদেহ ঢাকায় বারডেমে হিমঘরে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে আজ সোমবার সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বিকেলে তাকে হেলিকপ্টারযোগে সুন্দরগঞ্জে নেয়া হবে। সেখানে নামাজে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
উল্লেখ্য, গত শনিবার সন্ধ্যায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হন এমপি লিটন। পরে তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে রাত ৭টা ৪০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
এসময় তার সাথে ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন, তার স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদা জাহান স্মৃতি, দুলভাই ড. আব্দুল্লাহেল বারি, বড় বোন আফরোজা বাড়ি, স্ত্রীর ভাই দিদারুল আহসান, স্থানীয় নেতাকর্মী ছাড়াও রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি শাফিয়ার রহমান শফি, সেক্রেটারী তুষার কান্তি মন্ডল প্রমুখ।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top