বিকাল ৩:১৭, মঙ্গলবার, ৩০শে মে, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / একাত্তরের গপ্প
একাত্তরের গপ্প
জানুয়ারি ১৩, ২০১৭

 সাকি সোহাগ ,রহিমন বিবির কান্না কিছুতেই থামছে না। সে গলা ছেড়ে দিয়ে কাঁদছে।
আমাদের গ্রামটি শহরের খুব নিকটে। শহরে এখন তুমুল যুদ্ধ। তারপরেও গত কয়দিন ভালোই ছিল আমাদের এই গ্রামটি। আজ দুপুরে রহমত মিয়া মুক্তি বাহিনী থেকে এসে গ্রামের সবাই কে বলে দিয়েছে                                            
-খুব শীঘ্রি আমাদের গ্রামে মিলাটারিরা ঢুকে পরবে ।


তাই সবাই যার যার জীবনের ভয়ে এদিক সেদিক যেতে লাগলো। রহিমন বিবি তার যুবক দুই ছেলেকে নিয়ে আমাদের বাড়ীতে এসেছে বাবার কাছে। বাবা ও আমি সহ জব্বার আলী আর মুনসি মিয়া বেরুচ্ছি বাংকার খুঁড়তে এমন সময় রহিমন বিবি এসে বাবাকে বলছে – বড় মিয়া গো আমরার দুই পুত কেও লোন বাংকার খুরোনের লাই। আমরার তো কেউ নাই আমরা যামু কই!


আমরা সবাই মিলে আমাদের পুকুর পাড়ের সাথে লাগানো জমিনটার পূর্ব পাশে খুঁড়তে শুরু করলাম। মনসির মা’য় কাঁথা নিলো, রহিমন বিবির ঘরে চিড়া ছিল এক বোয়াম, সেটাও সাথে নিলো। আমার মা তো নাই, থাকলে হয়তো অনেক খাবার সাথে নিতো আমার জন্য। আমার মায়ের জীবনটা অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছে শয়তান মিলাটারিরা।


আমাদের প্রায় দুই দিন লাগলো বাংকার খুঁড়তে। জব্বার আলীদের বাঁশ ঝার থেকে কয়েকটা বঁাঁশ কাটা হলো। সেগুলো কবরের খারাল এর মত করে কেটে নেওয়া হলো। ওগুলো পরে আমরা বাংকারের উপরে ব্যবহার করি, তার উপরে আবার বাঁশের চাটাই বিছায়। সব উপরে মাটি দিয়ে ঢেকে রাখি। এক পাশে একটু ফাঁক রাখা হলো যাতায়াত করার জন্য। খুব ছোট একটা ফাঁক একজনের বেশি যাওয়া আসা করা যায় না। আমরা যে যার প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে রাতেই বাংকারে থাকার ব্যবস্থা করলাম। আমাদের ঘরে মোম ছিল কয়েকটা, সেগুলো সহ বাবা আরো কিছু মোম কিনে দিলো। রাতে খুদ রান্না হলো সাথে আলু ভর্তা। আমার এখনো মনে পরে সেই রাতের কথা, কেবল ঐরাতেই পেট ভরে খেয়েছিলাম আগামী ছ’মাসের মধ্যে।


রহিমন বিবি কাঁথা বিছায়তাছে বাংকারের ভিতর। এক পাশে মোম জ্বলছে অবিরত। মোমের জ্বলা দেখে মনে হচ্ছে -আমাদের থেকেও ঐ মোমটা বড় অসহায়।
বাংকারের এক কোনে আমরা সবাই বসে আছি, শোয়ার জন্য। আমরা সবাই শুই নাই। বাবা আর জব্বার আলী উপরে উঠলো বিড়ি খাওয়ার জন্য।
বাবা বিড়ি টানতে টানতেই অন্যমনষ্ক ভাবে বলছে –
‘দেখ মিয়া জব্বার আলী, আমরা তো এ দেশেরই মানুষ, এই দেশ জাতি সমাজ সবই তো আমাদের, দেশের জন্য কিছু করা উচিত।’
জব্বার আলী বিড়িটা মুখ থেকে সরিয়ে আকাশ দিকে ধুয়া ছাড়ছে আর বলছে –
‘হ মিয়া ঠিকই কইছেন।’


বাংকারের মধ্যে থাকতে হঠাৎ কবরের কথা মনে পরাই সারা শরির শিহরে উঠলো। এখানে এত মানুষ, কিন্তু কবরের মধ্য শুধু একা থাকতে হবে। এখানে আলো আছে, সেখানে আলোও থাকবে না, চারিদিকে শুধু অন্ধকার।


আর গভিরে যেতে ইচ্ছে করলো না ভয় করছে, খুব ভয়। হঠাৎ গুলির শব্দে সবাই আঁতকে উঠলে। ফটফট করে উপরে কয়েকটা গুলি করার শব্দ হলো।
বাবা আর জব্বার আলী যুদ্ধে যাবে। বাবা যাওয়ার সময় আমার দিকে একবার করুন চোখে তাকালো। সেই চাহনি যে শেষ চাহনি হবে তা আমি কখনই জানতাম না।
বাবা ও জব্বার আলী যাওয়ার কয়েক দিন পর শোনা গেল রহিমন বিবির স্বামী মারা পরছে। রহিমন বিবির কান্না সামলাতে মনসির মা’য় সিওরে বসে আছে। ছেলে দু’জন শব্দ ছাড়া কাঁদছে। সব যুবক ছেলেরাই শব্দ করে কাঁদতে পারে না। মুনসি মায়ের আঁচল ধরে আছে। চোখ দু’টি টলমল করছে এই বুঝি কাঁদবে।


রহিমন বিবির ছেলেরা বাবার এই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছে না। তারা দু’জনেও যুদ্ধে যাবে মায়ের কাছে আব্দার করলো। মায়ের মন তাই কী যেতে দেবে ! কিন্তু রহিমন বিবি শক্ত মনে বলছে – ‘যা তোরা, তোরার বাবার প্রতিশোধ নিবি।’


পরদিন সকালে ওরা দুই ভাই যুদ্ধে বেরুলো। দুই ভাইকে বিদায় দিয়ে রহিমন বিবি অসুস্থ হয়ে পরলো প্রায়।
সেদিন আর খাওয়ার কিছু নেই। একটু চিরা ছিলো আমি আর মুনসি মিয়া খেয়ে শুয়ে পরলাম। কিন্তু ঘুম ধরছে না খিদার যন্ত্রনায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা হয়নি। খুদায় দাঁড়াতে পারছি না। মুনসি মিয়া এখনো ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ বাংকারের উপর থেকে জব্বার আলীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল। বোধহলো খাবার নিয়ে
আসছে। কিন্তু না রহিমন বিবির বড় ছেলের রক্তাক্ত তাজা লাশ নিয়ে আসছে, ছোট ছেলের লাশ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top