রাত ১:২১, বৃহস্পতিবার, ২৮শে জুন, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / ঈদ চাঁদাবাজি বন্ধ হোক
ঈদ চাঁদাবাজি বন্ধ হোক
জুন ১৮, ২০১৭

মীর আব্দুল আলীম : ১২ জুনের ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকা ছেপেছে “ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য”। প্রতিবছরই ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বাড়ে। এবারের ঈদও তার ব্যতিক্রম নয়। ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একশ্রেণির চাঁদাবাজ।

এ দৌড়ে এক শ্রেণির পুলিশ সদস্যও পিছিয়ে নেই। ঈদ বকশিশের নামে সড়ক-মহাসড়ক, বাস টার্মিনালে চালানো হচ্ছে চাঁদাবাজি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ উপার্জন, নিরীহদের আটক করে মারধর, ভয়ভীতি দেখিয়ে উৎকোচ আদায়, অর্থের বিনিময়ে অপরাধী ছেড়ে দেওয়া ছাড়াও মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের মতো কর্মকা  চলছে।


চাঁদাবাজরা কিন্তু গর্তে লুকিয়ে থেকে চাঁদাবাজি করছে না! প্রকাশ্যেই চলছে তাদের এমন তৎপরতা। তাহলে কেন তাদের নির্মূল করা যাচ্ছে না? সরকার ধরে ধরে রাজাকার ও জঙ্গি নির্মূল করতে পারলে চাঁদাবাজদের বেলায় ব্যর্থ হচ্ছে কেন? জঙ্গি নির্মূল অসাধ্য মনে হলেও সরকার এ কাজে সফল হয়েছে। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা তো আত্মগোপনে নেই! তাছাড়া পুলিশের কর্মকান্ড তো চলে অনেকটা প্রকাশ্যে। প্রকাশ্যে থাকার পরও তাদের দমনে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক।


ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মিদের ইন্ধনে দেশের ফুটপাতগুলোয়ও এখন চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। ঈদ বকশিশের নামে এখন দ্বিগুণ করা হয়েছে চাঁদার হার। ফুটপাত থেকে পুলিশের লাগাতার চাঁদাবাজির প্রতিবাদে অতীত নিকটে দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষোভ মিছিল করেও ব্যবসায়ীরা সুফল পাচ্ছে না। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ হকার্স লীগের সভাপতি এম এ কাশেম পত্রিকাকে জানান, ঈদ উপলক্ষে রোজার শুরু থেকেই ডাবল নেওয়া শুরু হয়েছে হকারদের কাছ থেকে। কিছু পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার নামে দ্বিগুণ করা হয়েছে চাঁদার হার। এই দৌরাত্ম্য সারা দেশেই চলছে।  


ঈদ বাণিজ্যের নামে হয়রানির কারণে মহাভোগান্তিতে আছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। শুধু আঞ্চলিক সড়ক নয়, মহাসড়কেও প্রকাশ্যে চলছে চাঁদাবাজি। চাওয়া মাত্রই টাকা না দিলে ভেঙে ফেলা হচ্ছে যানবাহনের লুকিং গ্লাস, চালকদের শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। রাজধানী ঢাকার কাছে সোনারগাঁয়ের মেঘনা ব্রিজের টোলপ্লাজায় এক শ্রেণির পুলিশ এবং রাজনৈতিক দলের লোকজন সম্মিলিত ভাবে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজির খবর পত্রিকায় পাওয়া যাচ্ছে।


দেশের সড়ক, মহাসড়কে বাস ট্রাক প্রাইভেট কার থামিয়ে নানা অজুহাতে ব্যাপক চাঁদাবাজি হচ্ছে। অন্যদিকে কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে ‘যানজট নিরসন প্রকল্পের’ নামে রসিদ দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চলছে। এজন্য প্রবেশ পথে মোতায়েন করা হয় লাঠিয়াল বাহিনী। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে তাকে হয়রানি ও মারধর করা হচ্ছে।


গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী চাঁদাবাজদের অধিকাংশেরই বড়ভাই, লাটভাই জাতীয় কোনো অভিভাবক আছে, যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে। এজন্যই কি চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা চাঁদা দাবি করে শাসানি, প্রাণনাশের হুমকি এবং সেইসঙ্গে ‘মৃত্যু পরোয়ানা’ হিসেবে কাফনের কাপড় পাঠানোর ভয়াবহ তৎপরতাও কখনো কখনো লক্ষ্য করা যায়।

 বস্তুত চাঁদাবাজি, বিশেষ করে ঈদের সময় চাঁদাবাজি হবে না, এদেশে তা স্বপ্নেরও অগোচর। ব্যবসায়ী তথা দেশবাসী যেন বিষয়টিকে তাদের নিয়তি হিসেবেই মেনে নিয়েছে। সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছোট দোকান মালিকরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।


ঈদকালীন চাঁদাবাজিতে চাঁদাবাজরা বরাবর সক্রিয় থাকলেও এবার যেন তারা অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মতিঝিল, ফকিরাপুল, গুলিস্তান, এলিফ্যান্ট রোডের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, নামকরা শীর্ষ সন্ত্রাসী, মৌসুমি চাঁদাবাজ, এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীরাই শুধু চাঁদা নিচ্ছে না। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাঁদা আদায় করছে হিজড়ারা। শারীরিক অক্ষমতার অজুহাতে এরা নানা দলে বিভক্ত হয়ে বাসাবাড়ি, যানবাহন ও ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সর্বত্র চাঁদাবাজির উৎসবে মেতে উঠেছে।


বছরের অন্যান্য সময় চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকলেও ঈদ উপলক্ষে চাঁদাবাজরা এখন সত্যিই বেপরোয়া। ঈদ সামনে রেখে পরিবহন সেক্টরে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। এ সেক্টরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, চাঁদাবাজির ঘটনায় অনেক সময় এক শ্রেণির অসাধু পুলিশ জড়িত থাকায় চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছে না মানুষ।


ঈদ বকশিশের নামে বিভিন্ন কৌশলে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকর্মি ও পুলিশ বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ঘটনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে থানায় ডায়েরি ও মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা নীরব থাকছেন। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, চাঁদাবাজদের সামাল দিতে গিয়ে তাদের এখন ত্রাহি মধূসুদন অবস্থা। জানা গেছে, এলাকার বড় বড় সন্ত্রাসীর নাম করে চাঁদা চাওয়া হচ্ছে।

 অনেক  দাগি সন্ত্রাসী এলাকায় না থাকলেও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এলাকার কিছু মাস্তান রাজনৈতিক নেতার পরিচয়েও চাঁদাবাজি করছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য হল, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইন শৃংখলা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোথাও চাঁদাবাজির খবর পাওয়া গেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তাহলে কেন চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না? এ প্রশ্নের উত্তরই বা কী দেবেন তারা?

বস্তুত শুধু শুকনো কথায় চিঁড়া ভিজবে না। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের সমূলে উৎপাটন করে পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের জানানো হয়েছে, চাঁদা দাবি করে কেউ ফোন করলেই যেন পুলিশে খবর দেয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদেরও উচিত পুলিশকে সহযোগিতা করা। ঈদ চাঁদাবাজিসহ সাংবাৎসরিক চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধে আইন শৃংখলা বাহিনীর আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। কোন এলাকায় কোন চক্র চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে, তা পুলিশের অজানা থাকার কথা নয়।

 এদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ঈদ ছাড়াও অবিরাম চাঁদাবাজি চলে দেশে। অনেক সময় উপলক্ষ তৈরি করেও চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় বিদেশে পলাতক কয়েকজন সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করেও চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। এসব চাঁদাবাজের হুমকির মুখে অনেক ব্যবসায়ী আতংকে দিনাতিপাত করছেন। এ কথা ঠিক, আইনশৃংখলা বাহিনী, বিশেষত র‌্যাব সদস্যরা চাঁদাবাজদের মনে কিছুটা হলেও ভয় ঢুকাতে সক্ষম হয়েছে, যে কারণে সরাসরি চাঁদা চাওয়ায় ঘটনা আগের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। তার বদলে চলছে ফোনে চাঁদাবাজি।  


একটি সুস্থ সমাজ সর্বদাই আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। চাঁদাবাজি সুস্থ সমাজ কাঠামোয় বিশৃংখলা সৃষ্টি করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত হলে চাঁদাবাজি কমে আসবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। জোরপূর্বক কারও কাছ থেকে চাঁদা আদায় নিঃসন্দেহে অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দল ও সংস্থার নামেও চাঁদা আদায় করে থাকে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে এ ধরনের চাঁদাবাজি বেশি লক্ষ্য করা যায়। চাঁদা আদায় হয় হাট-বাজারে, ফেরিঘাটে, সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালীর নামে।

 ঈদের সময় বাস ভাড়া বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। এর পেছনে সংশ্লিষ্টদের স্বেচ্ছাচারিতা যেমন রয়েছে, তেমনি চাঁদাবাজরাও এজন্য দায়ী। অবস্থাদৃষ্টে মনে হওয়া স্বাভাবিক, এদেশে চাঁদা না দিয়ে কোনো ব্যবসা করা সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান পত্রিকায় জানা, কিছু পুলিশ সদস্য অসদুপায় অবলম্বন করে অর্থ উপার্জন করছেন বলে যে অভিযোগ উঠছে তার অন্যতম কারণ পুলিশের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতে অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং অস্বচ্ছতা।

 অপরাধ কমাতে হলে সবার আগে এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে হবে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি এই তিন জায়গায় স্বচ্ছতা আনা সম্ভব না হলে প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতি কমবে না। সৎ কর্মকর্তাদের গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিকতার প্রভাবমুক্ত করতে হবে পুলিশ বাহিনীকে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়ীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হলে অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশেই কমবে বলে আমরা মনে করি।


সর্বোপরি বলবো, ঈদকে সামনে রেখে সমাজে শান্তি-শৃংখলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারীসহ অন্যান্য অপরাধীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শনের কোনো বিকল্প নেই। চাঁদাবাজদের গ্রেফতারের পর প্রায়ই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে সহজেই ছাড়া পায়। তাছাড়া জেল থেকে বের হয়ে চাঁদাবাজরা আরও সংহারী মূর্তি ধারণ করে। এমন যেন না হয়। আইন শৃংখলা বাহিনীর ওপর আমরা আস্থা রাখতে চাই। চাঁদাবাজদের দমনে আইনশৃংখলা বাহিনীর আন্তরিকতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও ভাবতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
 newsstore13@gmail.com
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top