রাত ৩:০১, সোমবার, ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / ইপ্সিতা আর ডাকটিকেট পল্লব শাহরিয়ার
ইপ্সিতা আর ডাকটিকেট পল্লব শাহরিয়ার
December 30th, 2016

স্কুল থেকে ফিরে ঘরে ঢুকেই ভুরু কুঁচকে গেল ইপ্সিতার। তার লেখা প্রথম চিঠিটা পড়ে আছে পড়ার টেবিলে, তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে লেখা, যে কিনা তাকে ছেড়ে অনেক দুরে আছে।

‘বাবা’ তোমাকে যে বললাম চিঠিটা পোস্ট করে দিতে, তুমি দিলে না, এখন ওর জন্মদিনটা চলে যাবে আমার চিঠি আর পৌছাবে না। ঘরে ঢুকে বাবা বলে আরে শুধু খসখসিয়ে চিঠি লিখে খামে পুরলেই হবে? চিঠির পায়ে চাকা কই?
চাকা? আমি তো ঠিকানা লিখেই দিয়েছি।

ওরে আমার বোকা মেয়ে, চাকা মানে স্ট্যাম্প, বাংলায় যাকে বলে ডাকটিকেট। যেটা ছাড়া চিঠির একচুলও নড়ার উপায় নেই।
এটা তো জানা ছিল না, ইপ্সিতার চোখ দু’টো চিকচিক করে ওঠে, তার মানে কি বাবার হাত ধরে আবার একটা না-জানা অন্ধকার গুহার সন্ধান পাবে সে? বাবা বলো না স্ট্যাম্প কি?

গলা খাঁকরিয়ে শুরু করে বাবা। ‘স্ট্যাম্প বা ডাকটিকেট হচ্ছে একটা খুব ছোট্ট কাগজের টুকরো যেটা চিঠিপত্র পাঠানোর কাজে লাগানো হয়। এই স্ট্যাম্প তৈরি করার জন্য বিশেষ ধরনের কাগজ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত আয়তকার এই কাগজের টুকরোটার গায়ে তার দাম মানে ১ টাকা ২ টাকা লেখা থাকে। স্ট্যাম্প পাওয়া যায় ডাকঘরে। যে ঠিকানায় চিঠি যাবে তার দূরত্ব মেপে ঠিক দামের ডাকটিকেট খামের ওপর সেঁটে দিতে হয়। আবার খামের ওজন বেশি হলে বেশি দামের ডাকটিকেট লাগাতে হয়।’

ইপ্সিতার মাথায় তিরবেগে প্রশ্ন ছুটে আসে। ‘আচ্ছা বাবা, এটা প্রথমবার কে আবিষ্কার করে?’
‘শুনলে অবাক হবি। আজ থেকে দেড়শো বছরেরও আগে ১৮৪০ সালের পয়লা মে ব্রিটেনে তৈরি হয় বিশে^ও প্রথম ডাকটিকেট পেরি ব্ল্যাক। স্যার রোনাল্ড হিল প্রথম ডাকটিকেট বানানোর প্রস্তাব দেন। আর সেই স্ট্যাম্পে ছবি ছিল রানি ভিক্টোরিয়ার।’

‘আচ্ছা বাবা, পৃথিবীর সব দেশেই তো ডাকটিকেট আছে তাই না?’ ইপ্সিতার চোখে শুধুই টুকরো টুকরো কাগজ আর তাকে ঘিরে জিজ্ঞাসা চিহ্ন।
হ্যাঁ, তা আছে। তবে সব দেশের কথা বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। তার চেয়ে কিছু অদ্ভুত ডাকটিকেটর কথা বলি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাকটিকেট তৈরি হয়েছিলো চিনে ১৯১৩ সালে। আবার পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরও ডাকটিকেট হল ব্লু নোজ স্ট্যাম্প। ১৯২৯ সালে এটি কানাডায় তৈরি হয়। বছর দশেক আগে ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়া ক্রিস্টালখচিত স্ট্যাম্প বানায়। ২০০৫ সালে ফ্রান্স প্রথমবার সুগন্ধী ডাকটিকেট প্রকাশ করে, মিষ্টি আনারসের গন্ধে ভরপুর ছিল সেই স্ট্যাম্প।

২০০৩ সালে রাশিয়া ডেভিস কাপকে মনে রেখে ক্লে-টেনিস কোর্টেও ডাকটিকেট তৈরি করেছিলো, আর তাতে নাকি সত্যিকারের ক্লে ব্যবহার করা হয়েছিলো। এরকম আরো অনেক উদ্ভট ডাকটিকেট সারা বিশ^ জুড়ে ছড়িয়ে ছটিয়ে আছে। যেমন টিনের পাতে ডাকটিকেট, সুতোর কাজের ডাকটিকেট, কর্কের ডাকটিকেট। তবে এদের সব্বার মধ্যে সবচেয়ে মহার্ঘ ডাকটিকেট হল ট্রেসকিলিং ইয়েলো স্ট্যাম্প। মজার ব্যাপার কী জানিস, ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত এই সুইডিশ স্ট্যাম্পটা আসলে ছাপার ভুলে তৈরি হয়েছিল। মানে স্ট্যাম্পটা ছাপার সময় সবুজ বদলে হলুদ রঙে ছাপা হয়েছিল। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই ডাকটিকেট এর দাম ছিল ৩০ লক্ষ ডলারেরও বেশি। তারপর ২০১০ সালে আবার এটাকে বিক্রি করা হয় তবে তার দাম প্রকাশ করা হয়নি।

ইপ্সিতা ভাবতে থাকে। ভাবে এই কাগজের টুকরোর কথা, ভাবে সাদা পাতায় লেখা অক্ষর-শব্দ-বাক্যগুলো এই কাগজের টুকরোটা ছাড়া কীরকম অসহায়, যেন ডানা কাটা পাখি। আজ বাবা না বললে সে জানতেই পারত না। তার মাথার মধ্যে কেমন একটা তেরেকেটে তাকতাক নেচে চলে বিস্ময়। ঘুরপাক খায় অবাক হওয়াগুলো। একটা ছোট্ট কাগজ, অথচ তাকে নিয়ে সারা দুনিয়া কীসব কান্ড কারখানাই না হয়েছে, হয়ে চলছে।
‘আর একটা শেষ কথা বলি’.. বাবার কথায় সম্বিৎ ফিরে পায় সে। বাবা বলে চলে জানিস, অনেক মানুষ আছেন, যাদের শখ ডাকটিকেট সংগ্রহ করা, এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করা। একে বলে ফিল্যাটেলি’। বাবা উঠে পড়ে।
ইপ্সিতা খাম বন্ধ চিঠিটা নিয়ে ওলটাতে থাকে, হঠাৎ মাথায় আসে আসল কথাটাই তো জানা হল না। ‘আমার চিঠিটার জন্য কত টাকার স্ট্যাম্প লাগবে বললে না তো?’
বাবা অন্য ঘর থেকে হেসে বলে ‘পাঁচ টাকার….’



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :