বিকাল ৩:১১, রবিবার, ৩০শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / ইতিহাসের পরিক্রমায় আধুনিক বগুড়া
ইতিহাসের পরিক্রমায় আধুনিক বগুড়া
মার্চ ২৯, ২০১৭

মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান : শত বর্ষ-শতবর্ষ করে হাজার বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা “পুন্ড্র” আজকের বগুড়া, বাংলাদেশ অন্যতম সমৃদ্ধ জনপদ, যা বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের লীলাভূমি, পাল রাজাদের রাজধানী, পুন্ড্রবর্ধন রাজ্যের বিখ্যাত পুন্ড্রনগর।

আজও প্রাচীর ঘেরানগরের ভগ্নাবশেষ যার স্মৃতিবহন করেছে। বৌদ্ধ সভ্যতার স্মারকচিহ্ন গোকুলের বৌদ্ধ স্তুপ এবং বর্তমান বিহার নামক গ্রামে অবস্থিত ছিল বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠ। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পরিবর্তনে এবং কালের করাল গ্রাসে যা বিলীন প্রায়।শুধু যে প্রাচীনকালে এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা নয়। মধ্য যুগেও বগুড়া ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

 এ অঞ্চলে এসেছেন পাঠান স¤্রাট শেরশাহ। যার নামে হয়েছে বর্তমান শেরপুর উপজেলা। মোঘল স¤্রাট শাহজাহান, যার নামে হয়েছে শাজাহানপুর উপজেলা। স¤্রাট জাহাঙ্গীরের নামে জাহাঙ্গীরাবাদ। শাহজাদা সুজার নামে সুজাপুর গ্রাম। সেন বংশের সর্বশেষ রাজা লক্ষণ সেনকে বিতাড়িত করেই ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি এ অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীনে আনেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১২০৬ থেকে ১২৮১ সাল পর্যন্ত ১৭ জন মুসলিম শাসক এ অঞ্চলে শাসন করেন। সর্বশেষ সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবনের পুত্র নাসির উদ্দীন বলবন ওরফে “বগ্রা” খান বঙ্গদেশের শাসনকর্তা ছিলেন।

 বলা হয়ে থাকে “বগ্রা” খানের নামানুসারেই এ অঞ্চলের নাম বগুড়া হয়। এখানে পাওয়া গেছে সুলতানি আমলের মুদ্রা। পাওয়া গেছে জৈন, বৌদ্ধ এবং হিন্দুযুগের নানামূর্তি ও পুরাকীর্তি। যা মধ্যযুগের উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের স্বাক্ষর বহন করে। (আখতার উদ্দিন মানিক, বগুড়া চরিত কোষ, পৃ. ১১) আধুনিক কালের বগুড়াও কম গৌরবমন্ডিত নয়। বর্তমানে এক আলো ঝলমলে আধুনিক নগরী।

 উত্তরবঙ্গের রাজধানী নামে খ্যাত তথা সমগ্র বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ জেলা সদর “উত্তরের সদর দরজা”হচ্ছে হাজার বছর পূর্বের জনবসতি পুন্ড্রবর্ধন খ্যাত বগুড়া। ১৮২১ সালে দিনাজপুর জেলার লালবাজার (বর্তমানে পাঁচবিবি থানা), ক্ষেতলাল ও বদলগাছী, রংপুর জেলার গোবিন্দগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ এবং রাজশাহী জেলার বগুড়া, আদমদীঘি, নওখিলা (বর্তমানে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলা) ও শেরপুর থানা সমূহ একত্রিত করে বগুড়া জেলা গঠন করা হয়।

 সেই সময় ফৌজদারী বিচার প্রশাসনের তত্ত্বাবধানের জন্য একজন জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন। ১৮৩২ সালে এ জেলার জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট-কে ডেপুটি কালেক্টরের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। ১৮৫৯ সালে জেলার জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টরের পদকে একটা স্বতন্ত্র জেলা হিসাবে পরিগণিত হয়। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীয়করণ ও পুনর্গঠন নীতির অধীনে বগুড়া জেলার জয়পুরহাট মহকুমা জেলায় উন্নিত হয়।


ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝিতেও ইতিহাস বলতে বুঝাতো রাজণ্যবর্গ ও তাঁদের সামরিক কীর্তিকলাপের ইতিবৃত্তকেই। কিন্তু আধুনিককালের খ্যাতিমান ঐতিহাসিক ক.গ. অংযৎধভ (কুনওয়ার মুহাম্মদ আশরাফ) ইতিহাসের এই চিরাচরিত সংজ্ঞা-কে পাল্টে দিয়ে ইতিহাসের বিষয়বস্তুর রাজনৈতিক ও সামরিক কীর্তিকলাপ ছাড়াও অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক তথা মানবজীবনের সকল ঘটনাবলীকে তিনি ইতিহাসের বিষয়বস্তুতে রূপ দেন। মানুষ সামাজিক জীব। সভ্যতার আদিকাল থেকেই মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে আসছে।

 যা আমরা প্রাচীন মেসোপটেমীয়, মিশরীয়, সিন্ধু প্রভৃতি সভ্যতার নিদর্শনা সমূহ পর্যালোচনা করলে বুঝতে পারি। মানবজাতি সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করত। কালের বিবর্তনে মানুষের সামাজিক ও সংস্কৃতিতেও আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী তার বাঁচার আর সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে চলছে। পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের ন্যায় বগুড়া জেলাও এর ব্যতিক্রম নয়। ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত প্রাচীন পুন্ড্র নগর গড়ে উঠেছিল খর¯্রােতা করতোয়া নদীর তীরে। নদীবিধৌত বাঙালির জীবনের নদীর গুরুত্ব অপরিসীম।

 প্রাচীনকাল থেকে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল নদীকেন্দ্রিক, বগুড়ার “করতোয়া” নদী বগুড়া জেলাকে পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত করেছে। খন্ডিত পশ্চিমাঞ্চলেই লালমাটির অধ্যুষণ। আর পূর্বাঞ্চল পলল এলাকা। পূর্বাঞ্চলের উর্বর পলিতে ধান ছাড়াও পাট, কালাই, শাক-সবজি, রবি শস্য উৎপন্ন হয়। প্রতিবছর বর্ষার কারণে মাছের প্রাচুর্য এ অঞ্চলে বেশি ছিল। পশ্চিমাঞ্চলকে মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায়“খিয়ের” অঞ্চল বলা হয়। ধানই এখন পর্যন্ত এ এলাকার প্রধান উৎপন্ন শস্য, গরুর চেয়ে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে মহিষের গুরুত্ব এখনও পর্যন্ত এ অঞ্চলে বেশি।


আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে প্রাচীন ধ্যান-ধারণার যে পরিবর্তন ঘটেছে তা শহরাঞ্চলে যতটা ব্যাপক গ্রামাঞ্চলে ততটা নয়। গ্রাম্য মাতব্বর, মহাজন,  জোতদার উচ্চতর শ্রেণীগুলির পূর্বের প্রবল প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। মামলা মোকদ্দমা, অত্যাচার, অনাচার বর্তমানে থাকলেও স্বার্থান্বেষী ও কুচক্রী মহল প্রায়ই জনগণের প্রতিরোধ সম্মুখীন হচ্ছে। জীবনযাত্রার সাম্প্রতিককালের প্রভাব একদিকে যেমন স্পষ্ট অপরদিকে নগর ও যান্ত্রিক সভ্যতার জটিলতার প্রভাবে গ্রামীণ জীবনের ক্ষতিকর দিকটিও লক্ষ্যণীয়।

 সংস্কৃতিহল একটি গোষ্ঠীতে পুুরুষানুক্রমে তৈরী জীবনযাত্রার ছক, খাদ্যাভ্যাস, পরিধেয় বস্ত্র, সৌন্দর্য্য-চর্চা, শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবহারিক উপাদান, উৎপাদনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া, বিনোদন, প্রথা, আচার-বিশ্বাস, ধর্মাচরণ, শিল্প-সাহিত্য, আবাসন, ভাষা ও তার প্রয়োগ, সামাজিক উৎসব ও সংস্কার ইত্যাদি বিষয়াদি। বগুড়া জেলা প্রাচীনকাল থেকেই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে গৌরব উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে।

 বিভিন্ন স্থাপত্য, পোড়া মাটির শিল্প বিভিন্ন আমলের পাওয়া মুদ্রা, মূর্তি আজও সমুজ্জ্বল সংস্কৃতির স্বাক্ষর বহন করেছে। আধুনিককালেও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বগুড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। খ্যাতিমান শিল্পী আমিনুল হক দুলালের অমরকীর্তি “আজব গুহা”মৃৎশিল্প ছিল অনন্য কীর্তি। নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে বগুড়ার রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। বগুড়া জেলায় আধুনিক নাট্য চর্চার যাত্রা হয় ১৯০৫ সালের শখের নাট্যশালা “এডওয়ার্ড ড্রামাটিক এসোসিয়েশন” সংক্ষেপে ইডিএ-এর মধ্যে দিয়ে। বগুড়াকে বলা হয় “পত্রিকার নগরী”। আজও অবধি উত্তরবঙ্গ থেকে সর্বোচ্চ পত্রিকা বের হয় বগুড়া থেকে।
বগুড়া জেলার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ইতিহাস বেশ সমুজ্জ্বল।
লেখক ঃ এম. ফিল গবেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top