বিকাল ৪:৩৬, শনিবার, ২১শে জানুয়ারি, ২০১৭ ইং
/ সম্পাদকীয় / ইতিবাচক রাজনীতির জয় হোক
ইতিবাচক রাজনীতির জয় হোক
December 21st, 2016

আতাউর রহমান মিটন ;সপ্তাহের শুরুটা হয়েছে ইতিবাচক রাজনীতি দিয়ে। গত ১৮ ডিসেম্বর, রবিবার মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বৈঠক করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

বৈঠক শেষে উভয় পক্ষই আলাদা আলাদাভাবে বিবৃতি দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় বৈঠকটি ফলপ্রসু হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। যদিও এই বৈঠক শেষ কথা নয়, তথাপি রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ শুরুটাকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবেই দেখছেন। এই ধারা ধরে রাখতে হবে এবং বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অশান্ত, অগণতান্ত্রিক, একচেটিয়া, কিংবা গায়ের জোর দিয়ে স্থিতিশীল

 

রাজনীতি বা অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সুতরাং সংলাপ হতেই হবে।
বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কি হবে তা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে আমাদের রাজনীতি উত্তপ্ত। এরশাদের আমলেও ভোট ও ভাতের অধিকারের নিশ্চয়তার দাবি তোলা হয়েছে। শ্লোগান দেয়া হয়েছে, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশী তাকে দেব’। এরপর খালেদা সরকারের আমলেই শুরু হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি। শুরু হয় রাজপথে আগুন জ্বালানো সংগ্রাম। এখনও সেই আন্দোলন চলছে। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি প্রথম তোলা হয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই। আর এখন সেই আওয়ামী লীগ সরকারই সংবিধান সংশোধন করে এই ব্যবস্থাকে পুরোপুরি আবদ্ধ করে ফেলেছে। বাংলাদেশের জনমত এখনও এই দাবিতে বিভক্ত। একদল মনে করে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, অন্যদল মনে করেন শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত হলে দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব।


বাস্তবে কোন পক্ষ সঠিক সেটা অতীতের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেও সহজেই বলে দেয়া যায়। তবে অতীতে যা হয়েছে আগামীতেও যে তাই-ই হবে সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। ভোট ডাকাতি তো একটা বিষয় বটেই পাশাপাশি রয়েছে দেশী-বিদেশী প্রচেষ্টায় জনমতকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা। এমনকি শোনা যাচ্ছে মার্কিন নির্বাচনেও রাশিয়া নাকি সাইবার হ্যাকিং এর মাধ্যমে ট্রাম্প এর বিজয় অর্জনকে সহায়তা করেছে। আমাদের নির্বাচনেও প্রতিবেশী কোন কোন দেশ ও গোষ্ঠীর প্রভাবের কথা শোনা যায়। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি ও উন্নত প্রযুক্তির এই সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন এখন আর কেবল নির্বাচন কমিশন এর একার বিষয় নয়, কিন্তু তাই বলে আমরা একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারি না। প্রসঙ্গতঃ একথাও বলে রাখা দরকার নির্বাচন কমিশন এর পাশাপাশি আরপিও সংশোধনসহ আরও কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন।  


রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে বিএনপি’র দেয়া ১৩ দফা প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই আলোচনা হয়েছে। উক্ত ১৩ দফায় বলা হয়েছে, (১) ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন, (২) প্রধান নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন কমিশনারদের খুঁজে বের করতে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন, (৩) বাছাই কমিটির আহ্বায়ক হবেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মক্ষম একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি যিনি বিতর্কিত নন এবং অবসর সময় সরকারের কোনও লাভজনক পদে আসীন হননি, (৪) বাছাই কমিটির অন্য সদস্যরা হবেন- আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, (৫) বাছাই কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের জন্য দুই জন ও চারজন নির্বাচন কমিশনারের জন্য ৮ জনের নামের তালিকা দেবেন। এই তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশন ও চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন, (৬) নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দল অথবা স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্যের ভিত্তিতে ইসি গঠন, (৭) কমিশনে অন্তত একজন প্রবীন মহিলা কমিশনার রাখা, (৮) নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদানের বিধান কমিশনের আরপিওতে সংযোজন, (৯) নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অথবা স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দলগুলো ২ জন করে ব্যক্তির নাম বাছাই কমিটির কাছে প্রস্তাব করবে, (১০) বাছাই কমিটিই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন, (১১) কেউ যদি দায়িত্ব পালনে অসম্মতি প্রকাশ করেন তাহলে একই প্রক্রিয়ায় পুনরায় কমিশনার নিয়োগ, (১২) প্রধান কমিশনার-সহ অন্যান্য কমিশনারদের হতে হবে দল নিরপেক্ষ, সর্বজন শ্রদ্ধেয় সৎ ব্যক্তি এবং (১৩) নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় গঠন।


উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরা এই ১৩ দফা প্রস্তাবনা বিএনপি’র পক্ষ থেকে ১৮ নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে জানানো হয়েছিল। সকলেই জানেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হবে। নতুন যে ইসি গঠিত হবে আইন অনুযায়ী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাদের তত্ত্বাবধানেই অনুষ্ঠিত হবে। দেশে-বিদেশে কেউই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি চান না। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আগামীর বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। সবার চাওয়া সকলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। সে কারণেই ইসি পুনর্গঠন নিয়ে এত আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক আর প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী প্রধান। নির্বাচন কমিশন গঠন করার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শক্রমে তিনি নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দিতে পারেন। বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার প্রধান এবং দলেরও প্রধান। রাষ্ট্রপতি একজন দলীয় ব্যক্তি এবং দলীয় প্রধানের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রশ্নাতীত। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী কি ভাবছেন, তিনি কি চাইছেন সেটা বিবেচনায় রেখেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নিবেন। সীমাবদ্ধতা ও সংশয় সেখানেই। 

আবার আশাবাদের দিকটি হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য আন্তরিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
এটা ঠিক যে, আওয়ামী লীগ কখনই ক্ষমতাচ্যুত হতে চাইবে না আবার বিএনপি’র নিশ্চিত লক্ষ্য হলো ক্ষমতায় যাওয়া। ক্ষমতা পাওয়া বা ধরে রাখার এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে সকলেই নিজেদের স্বার্থে কৌশল প্রয়োগ করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। যদিও তাত্ত্বিকভাবে চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের হাতে। আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচনে জনগণের সেই ভোটাধিকার সুরক্ষিত করাটাই বর্তমানের চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ অভিজ্ঞ রাজনীতিক। তিনি তৃণমূলের ভাষা বোঝেন। মানুষের আকাঙ্খা যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পরমত সহিষ্ণুতা এবং সকলের অংশগ্রহণে সচল গণতন্ত্র, সেটা মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিশ্চয় জানেন।

আমরা তাঁর সাফল্য কামনা করি। একটি বিদেশী পত্রিকার এক প্রতিবেদনে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এর একটি সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিতে বলা হয়েছে, ‘মানুষের দুঃখ অর্থের অভাবে যে পরিমাণ ঘটে, তাহার অধিক ঘটে ভালবাসার অভাবে।’ ধরা যাক কোন এক দৈব ক্ষমতাবলে যদি বিশ্বের দারিদ্র্য দূর করা যায়, তা হলে মানুষের দুঃখ কমবে মাত্র ৫%, আর যদি বিষাদ ও উদ্বেগ দূর করা যায় তা হলে দুঃখ করবে ২০%। সমীক্ষার ইঙ্গিত স্পষ্ট। মানুষ আর্থিক অভাবের চাইতে মনের শান্তিকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। সুতরাং আমাদের দেশ নি¤œ আয় থেকে মধ্যম আয় অথবা উন্নত অর্থনীতির দেশ হলেও যদি মানুষের মনে আমরা শান্তি ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হই তাহলে আমাদের বাহ্যিক উন্নতি কোন কাজে আসবে না।


বাংলাদেশের অর্থনীতি অগ্রসর হচ্ছে এবং আরও হবে। বিভিন্ন শিল্প কারখানার উদ্যোক্তাগণ এবং আমাদের পরিশ্রমী শ্রমিকেরা দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কাজ করছেন বিদেশে থাকা প্রায় ২৬ লাখের বেশি শ্রমজীবী মানুষ। নিজেদের প্রয়োজনেই তাঁরা আরও ভাল করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু এরাও অসুখী বোধ করে যখন দেশের মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব দেখা দেয়, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতেও ঘুষের ব্যবহারের কথা জানা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় যখন যে কোন পদায়ন বা নিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য উপাদানে পরিণত হয়, তখন মানুষের দুঃখ বেড়ে যায়। মানুষ রাজনীতিবিদদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের শঙ্কা তখনই জনমনে দানা বেঁধে ওঠে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হচ্ছে। গণমাধ্যম জুড়ে রয়েছে নাসিক নির্বাচনের সংবাদ। মানুষ দেখতে চায় এই নির্বাচনে সরকার কেমন আচরণ করে। নির্বাচন কমিশন এর পক্ষপাতদুষ্টতা অথবা রাজনৈতিক সরকারের অধীনে কার্যকারিতা দেখানোর সক্ষমতার অভাব কতখানি তা এই নির্বাচনে মানুষ প্রত্যক্ষ করবে।

যদিও নাসিক একটি স্থানীয় নির্বাচন এবং এই মূহুর্তে সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকার নীতিটাই গ্রহণ করবে তথাপি সর্ষের ভেতরের ভূতেরাও অনেক সময় সক্রিয় হয়ে উঠে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ফেলে। সেখানে একটি তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপের কথা বা প্রভাবের কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এমনও বলা হচ্ছে ‘ভূতুড়ে ভোটাররা’ নাসিক নির্বাচনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। কারা এই ‘ভূতুরে ভোটার’, কোথা থেকে, কিভাবে এরা আসবে? নির্বাচন কমিশন কি এদের ঠেকাতে পারবে? যদি না পারে তাহলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে আরও একটি ব্যর্থতার উদহারণ যোগ হবে, যা আমাদের কোনভাবেই কাম্য নয়।


আমরা জনগণ হাসিমুখে ঘুমাতে যেতে চাই। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে নিরুদ্বিগ্ন হৃদয়ে দিনাতিপাত করতে চাই। আমরা চাই আমাদের নেতারা পরার্থপরতার দিকে মনযোগ দিবেন, অর্থের প্রতি নয়। যে ইতিবাচক রাজনীতি বিএনপি শুরু করলো, আমরা জনগণ তা অব্যাহত দেখতে চাই। ‘সালিশ মানি কিন্তু তালগাছ আমার’- এই মনোভাব শুধু একটি মাত্র দল নয়, বরং যাঁরা একথা আজ বেশি বেশি বলছেন তাঁদের মধ্যেও অতীতে দেখা গেছে। আমরা অতীতের সেই কাসুন্দি ঘাটতে চাই না। আমরা ভবিষ্যতে নতুন কিছু দেখার প্রত্যাশা রাখতে চাই। আমরা জনগণ শান্তি চাই।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
সরঃড়হ২০২১@মসধরষ.পড়স
০১৭১১৫২৬৯৭৯

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :