দুপুর ১:২৪, শুক্রবার, ২৬শে মে, ২০১৭ ইং
/ রাজনীতি / আওয়ামী লীগ ছিল ফুরফুরে মেজাজে
সালতামামি- ২০১৬
আওয়ামী লীগ ছিল ফুরফুরে মেজাজে
ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬

মাহফুজ সাদি : ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ২০১৬ সালে অনেকটা ফুরফুরে মেজাজেই কাটিয়েছে। বছরটি ছিল অনেকটাই ভোটের বছর। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয় দিয়ে শুরু হয় দলটির বছর আর শেষও হয় সেই স্থানীয় সরকারের বিজয় দিয়ে। ভোটের মাঠে কখনো বিএনপি-জাতীয় পার্টি আবার কখনো নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে এবারের ইউপি ভোটে রেকর্ড সংখ্যক হতাহতের ঘটনাও ঘটে। মাঝখানে ঝমকালো দলের ২০তম জাতীয় ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন এবং নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন ছিল উল্লেখযোগ্য দিক। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে চাঙ্গা হয়েছে দলটি। তবে বিরোধী দলগুলো রাজপথে না থাকায় রাজনৈতিক মাঠে সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলা করতে না হলেও জঙ্গিবাদ বিরোধী আন্দোলন করতে হয়েছে। বিদায়ী বছরে বড় কোন রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না। তবে সরকারের কিছু কর্মকান্ডে সৃষ্ট অসন্তোষ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সর্বোপরি বছরটি ছিল আওয়ামী লীগের জন্য স্থিতিশীলতার বছর।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন : বছরের শুরুতে তেমন কোনো কর্মকান্ড ছিল না আওয়ামী লীগের। ফেব্রুয়ারিতে ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর থেকে শুরু হয় নির্বাচনের প্রস্তুতি। মোট ছয় ধাপে ৪ হাজার ২৭৯ ইউনিয়নে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে জালভোট, মারামারি, নজিরবিহীন প্রাণহানি, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতাসীন দলের লোক নির্বাচিত হওয়া নিয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে। পাশাপাশি নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বসে আনতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় আওয়ামী লীগকে। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ২৬৭২টি ইউপিতে জয় পায়। বিএনপি পায় ৩৭২ ও জাতীয় পার্টি ৫৭টি। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৮৮০টি ইউপিতে। যার বেশিরভাগই আবার আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ভোটে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কারের হিড়িক পড়েছিল বছরের শুরুতে। স্থানীয় সরকারের ইউপি ভোটে শতাধিক প্রাণহানি এবং সহস্রাধিক আহত হয়, যা রেকর্ড সংখ্যক হতাহতের ঘটনা বলে দেখা হয়।

জমকালো অনুষ্ঠানে সম্পাদক কাদের : আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার ২০তম জাতীয় কাউন্সিল করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কয়েক দফা তারিখ পরিবর্তনের পর গত ২৩ অক্টোবর ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এবার নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ওবায়দুল কাদের। কাউন্সিল শুরুর আগে থেকেই সাধারণ সম্পাদক কে হচ্ছেন এ নিয়ে চলছিল জোর আলোচনা। কাদেরের পাশাপাশি আলোচনায় ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর ও দুইবারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ড. আব্দুর রাজ্জাক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের নাম। তবে এদের মধ্যে আশরাফ ও কাদেরের নাম বেশি আলোচিত হয়েছে। তবে এবারের কাউন্সিলের সাজসজ্জা বিগত সব কাউন্সিলকে ছাপিয়ে গেছে। কাউন্সিলে বেশ কয়েকজন নতুন মুখ দেখা গেছে। তবে এবারের সেরা চমক হিসেবে কমিটিতে আসার ব্যাপারে আলোচনায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যরা। এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, রাদওয়ান সিদ্দিক ববির নাম। এদের মধ্যে জয়, পুতুল, ববিকে প্রথমবারের মতো দলের কাউন্সিলর বানানো হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এদের কাউকেই কমিটিতে রাখা হয়নি। তবে এখনো কমিটিতে রাখার পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। বর্তমান কমিটিতে এখনো বেশ গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি রাখা হয়েছে।

নাসিকে আইভীর জয় : বাংলাদেশের বন্দর নগরী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর জয় ছিল আওয়ামী লীগের একটি বড় সাফল্য। স্থানীয় প্রভাবশালী এমপি ও দলের নেতা শামীম ওসমানের সাথে কোন্দল মিটিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী শাখাওয়াত হোসেনকে বিপুল ভোটে পরাজিত করা এবং শন্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠানে দেশবাসীর নজর কেড়েছে। এ ভোটে ১৭৪টি কেন্দ্রে আইভী পান মোট ১,৭৫,৬১১ ভোট। অন্যদিকে ধানের শীষের শাখাওয়াত পান ৯৬,০৪৪ ভোট। ৭৯ হাজার ৫৬৭ ভোটের ব্যবধানে জয় পান আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এই নির্বাচনকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দলীয় কোন্দল ও রক্তাক্ত সংঘাত : বছরজুড়ে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ক্ষমাতসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। অসন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, চেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির জেরে নিজেদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেসচ্ছাসেবক লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এমনকি বেশ হয়েকটি হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটেছে, যা দেশব্যাপী নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। এসব কোন্দল মিটিয়ে দলের স্থানীয় নেতৃত্বে শৃঙ্খলা আনতে বারবার উদ্যোগী হতে হয়েছে কেন্দ্রকে। দলের হাই কমান্ডের নির্দেশে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে।
জেলা পরিষদ নির্বাচন : বিদায়ী বছর শেষ হয়েছে প্রথম বারের মতো স্থানীয় সরকারের জেলা পরিষদ নির্বাচন দিয়ে। ২৮ ডিসেম্বর তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১ জেলায় নির্বাচন হয়। বিএনপি-জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল পরোক্ষ এ নির্বাচন বর্জনের মধ্যে স্থগিত দুটি ছাড়া বাকি সবগুলোতেই জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে ২১টিতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং ২৪ টিতে ভোটে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। আর ১৪টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয় পান। দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত না হলেও এই নির্বাচনে দল থেকে প্রার্থীদের সমর্থন দেয়া ও নাম ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড একাধিক বৈঠক করে ৬১ জেলায় চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে দলটি।

জঙ্গিবাদের উত্থান মোকাবিলা : ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ দল এবং সরকার হিসেবে বেশি বিপদে ও আলোচনা ছিল জঙ্গিবাদ নিয়ে। বছরের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশে নতুন করে উৎপত্তি ঘটে ভয়াবহ জঙ্গিবাদের। দেশজুড়ে দেশী-বিদেশী বেশ কয়েকজন নাগরিক খুন হন। পহেলা জুলাই রাজধানীর গুলশানে একটি রেস্তোরাঁয় দেশী-বিদেশীসহ অর্ধশত নারী-পুরুষকে জিম্মি করে জঙ্গিরা। এ হামলায় ২ দুই পুলিশ কর্মকর্তা ও বিদেশী নাগরিকসহ ২৮ জন নিহত হন। এ হামলায় দেশী-বিদেশী চাপ বাড়তে থাকে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর। এর তিনদিন পরে দেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ শোলাকিয়া জঙ্গি হামলা হয়। এ ঘটনায় ২ পুলিশ, এক ‘জঙ্গি’ ও একজন সাধারণ নাগরিক নিহত হন। এসব জঙ্গি হামলার পর কদর বাড়ে ক্ষমতাসীন জোটের শরিকদলগুলোর। এসব হামলার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জঙ্গিবাদ বিরোধী সভা-সমাবেশ এবং মানববন্ধন করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত মানববন্ধন করা হয় ঢাকায়। রাজধানীর গাবতলী থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত মানববন্ধন করে ১৪ দলীয় জোট।

বিদায়ী বছর ২০১৬ সালকে আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে ভালো বছর উল্লেখ করে দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, এ বছরে বেশ কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার পরিণতি সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতি দল। আমরা নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন নিয়েও আশাবাদী। দেশের ইতিহাসে বিদায়ী বছরের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে নারায়াণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়ে সফলতার সঙ্গে বছরটি পার করল আওয়ামী লীগ।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top