রাত ২:৩৩, শুক্রবার, ২০শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ রাজনীতি / আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দুশ্চিন্তায় এমপি-মন্ত্রীরা তৃণমূলে নির্বাচনী প্রস্তুতি
২০ মে জেলা নেতাদের সাথে বসছেন শেখ হাসিনা
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দুশ্চিন্তায় এমপি-মন্ত্রীরা তৃণমূলে নির্বাচনী প্রস্তুতি
মে ১৫, ২০১৭

মাহফুজ সাদি : আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্ব চলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে একক ও ‘জনপ্রিয়’ প্রার্থী নিশ্চিত এবং তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ করতে চায় দলটি। এর অংশ হিসেবে আগামী ২০ মে জেলা নেতাদের সাথে বসছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। এর আগে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিরোধপূর্ণ কিছু জেলার নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। এদিকে দলীয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরুর পর ‘জনবিচ্ছিন্ন’, ‘গডফাদার’ ও ‘বিতর্কিত’ এমপি-মন্ত্রীদের প্রতি দলীয় প্রধানের কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। এতে মনোনয়ন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন শতাধিক বিতর্কিত এমপি-মন্ত্রী। অন্যদিকে এই ঘোষণায় উজ্জীবিত হয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশী তৃণমূল নেতারা নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। তারা নিজেদের জনপ্রিয়তা দেখানোর চেষ্টা করছেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নিবে এবং নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হবে। এজন্য তৃণমূলে ‘জনপ্রিয়’ ও ‘ক্লিন ইমেজের’ একক প্রার্থী চুড়ান্ত করতে চায় আওয়ামী লীগ, যাতে ভোটের লড়াইয়ে জয় নিয়ে ঘরে ফেরা যায়। এর অংশ হিসেবেই গত ৭ মে সংসদীয় দলের বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘জনবিচ্ছিন্ন’, ‘গডফাদার’ ও ‘বিতর্কিত’ এমপি-মন্ত্রীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের তালিকা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ওয়ার্ড থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরপর  সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, যেসব এমপির এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা নেই, জনপ্রিয়তা নেই, যারা তৃণমূল নেতাকর্মীদের দ্বিধা-বিভক্ত করেছেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে এলাকার জনগণের অভিযোগ রয়েছে তারা মনোনয়ন পাবেন না। এ সময় অন্যান্য মন্ত্রীও তার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেবে। চারদিক দিয়ে হিসাব-নিকাশ করে এই নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে। মন্ত্রী ও এমপিদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, দলকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সুসংগঠিত করে তুলতে হবে। কোনো কোনো জায়গায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে এমপি-মন্ত্রীদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এ দূরত্ব দ্রুত ঘোঁচাতে হবে। তা না হলে আপনারা (এমপি-মন্ত্রী) ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বর্তমানে এমপি আছেন, তারা নিশ্চিত মনোনয়ন পাবেন- এমন ধারণা নিয়ে থাকলে ভুল করবেন। কারণ আগামী নির্বাচন ২০১৪ সালের মতো হবে না। যারা এলাকার জনগণের জন্য কাজ করেছেন জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন তাদেরই মনোনয়ন দেয়া হবে। আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী জরিপের কথাও উল্লেখ করেছেন। জানা গেছে, বিতর্কিত এমপি-মন্ত্রীদের নিয়ে দলীয় প্রধানের কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পর থেকে তৃণমূলে চলছে নির্বচনী প্রস্তুতি। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী অনেক নেতা নিজেদের ‘জনপ্রিয়তা’ দেখাতে মাঠে নেমেছেন। জেলা পর্যায়ের অন্তত তিন নেতা বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রাধান্য দিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ নেতাকর্মীদের সাথে সময় দেওয়া তো দূরে থাক, অনেক সংসদ সদস্য আছেন ঢাকা ছেড়ে এলাকায় আসেননি গত তিন বছর। দলের নেতাকর্মীদের জেলে বন্দি হওয়ার পেছনেও অনেক এমপির ষড়যন্ত্র আছে। অন্তত ৩০টি জেলায় পাওয়া যাবে এমন নজির। বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, এমপি হিসেবে তৃণমূলে জনপ্রিয় হওয়া খুবই কঠিন। কারণ এমপিদের কাছে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাওয়া-পাওয়ার কোনো সীমা নেই। কিন্তু আমাদের ক্ষমতা অসীম নয়, তাই সব চাওয়া পূরণ করা সম্ভব হয় না। সংসদ সদস্যদের জনপ্রিয় হওয়া অনেক কঠিন। মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূলের কাছে জনপ্রিয়তাই যদি একমাত্র মানদণ্ড হয়, তাহলে একজন এমপিও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি জনপ্রিয়। ওইসব এমপিরা আরো বলেন, তৃণমূলের নেতাদের কাছে শতভাগ জনপ্রিয় হওয়া কষ্টসাধ্য। তাদের অনেক চাওয়া-পাওয়া থাকে। তা পূর্ণ করতে না পারলে সৎ থেকেও তৃণমূলে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় না।

২০ মে মুখ খুলতে পারে জেলা নেতারা: আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী ২০ মে সকাল সাড়ে ১০টায় দলের জেলা নেতাদের সাথে বৈঠকে বসছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এই মতবিনিময় সভার অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারেন তৃণমূলের নেতারা। একাধিক জেলা নেতার সাথে কথা বলে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। এই বৈঠক তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন নেতারা। জানা গেছে, এই সভায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের চূড়ান্ত নির্দেশনা দেবেন দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ সভায় নতুন সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হবে। এ লক্ষ্যে দলের সদস্যপদ নবায়নের পাশাপাশি নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযান চলবে। প্রতিটি সাংগঠনিক জেলায় একটি করে ল্যাপটপ দেওয়া হবে। এই ল্যাপটপ নিয়েই সদস্য সংগ্রহ শুরু করবেন তৃণমূল নেতারা। সদস্য সংগ্রহ অভিযান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন দলের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান। তাদের সহযোগিতা করবেন আট সাংগঠনিক সম্পাদক। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপিদের কী করলে মনোনয়ন পাবে আর কী করলে মনোনয়ন পাবে না, সেই প্রসঙ্গে কিছু বার্তা দিয়েছেন। শীর্ষ পর্যায় থেকে সতর্কতা অনেকের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কাজ দেখিয়ে তাদের অবস্থান সুসংহত করার সময় এখনও আছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, সংসদীয় দলের সভায় এমপিদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিষ্কার জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে যার যার কর্মফল মনোনয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। এতে তার কিছু করার নেই। যে জনপ্রিয় সে মনোনয়ন পাবে।

দলীয় সভাপতির বক্তব্য অনেকের ভেতরে দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। তবে এটাও সত্যি যে, ভালো কাজ করে থাকলে চিন্তামুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি মানুষের জন্য, তাই মানুষের সংস্পর্শে যেসব এমপি আছেন তারাই আবারও মনোনয়ন পাবেন। সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, বর্ধিত সভার মাধ্যমে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের বিবরণ জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য তৃণমূল নেতাদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে সরকারের গত আট বছরের উন্নয়নমূলক কাজের এবং আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী তৎপরতার ভিডিওচিত্র দেওয়া হবে। উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ূয়া বলেছেন, বিশেষ বর্ধিত সভার পর ২১ মে সকাল সাড়ে ১০টায় ধানমন্ডির প্রিয়াংকা কমিউনিটি সেন্টারে তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, উপ-দপ্তর সম্পাদক এবং উপ-প্রচার সম্পাদকদের বৈঠক হবে। বৈঠকে ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

 

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top