বিকাল ৩:০২, বৃহস্পতিবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / অন্ধকার দূর হবেই..
অন্ধকার দূর হবেই..
এপ্রিল ১৯, ২০১৭

সৈয়দ আহমেদ অটল: এ বছর   ছায়ানট-এর ৫০ বছরপূর্তি হলো। ছায়ানটের ইতিহাস, সংগ্রামী ইতিহাস। লক্ষ্য এবং আদর্শ যদি জনগণের নিমিত্তে হয়, তবে অন্ধকার দূর হবেই। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ছায়ানট সেই কাজটি সুচারুভাবে এগিয়ে নিয়েছে। সেই ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে। পাকিস্তানী অপসংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার যে উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী, ছায়ানট তা রুখে দিয়েছিল সাহসের সাথে। যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ড. সনজীদা খাতুনের হাত ধরে। জাতীয় জাগরণে গড়ে তোলেন ছায়ানট।


১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে প্রথম বর্ষবরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করে ছায়ানট। এখনো ড. সনজীদা খাতুন ছায়ানটের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তবে এবারের বৈশাখের প্রভাতে ছায়ানট তথা সনজীদা খাতুনকে সেই ৫০ বছর আগের চেহারায় যেন দেখতে পাওয়া যায়। প্রতি বছরই রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ বরণে ছায়ানট সমসাময়িক পরিস্থিতির উপর একটি ডাক দিয়ে যায়। এবারও ডাক দিয়েছে।

 

এবার ১৪২৪ বরণ করে নতুন সংগ্রামের আহবান  জানিয়েছেন ড. সনজীদা খাতুন তথা ছায়ানট। তিনি মানুষের কাছে মানবতার কথা পৌঁছে দিতে বলেছেন। ৮৫ বছরে এসে তিনি বলেছেন, ‘চল, মানুষের কাছে যাই’। প্রতি বৈশাখের প্রভাতে রমনার বটমূলে যাই ছায়ানটের অনুষ্ঠানে। বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। তা এক নাগাড়ে প্রায় ২০ বছর হলো। এই বিশ বছরের মধ্যে একজন রিপোর্টার হিসাবে ২০০১ সালে বোমা হামলাও প্রত্যক্ষ করেছি। রিপোর্ট করেছি। সেই বীভৎসতা আজও চোখের সামনে ভাসে।

 

বলতেই হবে আর সব বছরের মত এবারের ‘বৈশাখ উদযাপন’ ভিন্নতা ছিল। সে কথা বলতেই আজকের লেখা। পহেলা বৈশাখের কয়েক দিন আগে থেকেই অশুভ শব্দের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। ছিল পহেলা বৈশাখ পালনের বিরোধিতা। একই কথা শোনা যায় মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে। গত বছরও যেমন বিকাল ৫টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করে সবাইকে ঘরে বন্দী হতে বলা হয়েছিল, এবারও ছিল তাই।

 

এ নিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদী হতে দেখা গেছে সুরের মূর্চ্ছনায়! তার আগে সাম্প্রতিক সময়ে পাঠ্যপুস্তকের গল্প-কবিতায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটা যে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একটি মহলকে কাছে পেতে, খুশি করতেই এমনকি ‘রাজনৈতিক কৌশলের’ অংশ হিসাবেই এটা করা হয়েছে।

 

 পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন যখন ধরা পড়লো- তখন দেখা গেল এসব ভূতুড়ে ভাবে ঘটেছে। হতেই পারে, কেননা ভূতের আবার অনেকগুলো পা! পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথের কবিতা লেখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তা সফল হয়নি। যে লেখে সেটা যে তারই কবিতা হয় তা ‘বলদেরা’ বোঝে না। ‘বলদেরা’ শুধু জানে ‘হুজুরকে’ সন্তুষ্ট রাখতে পারলেই প্রমোশন। কিন্তু একদিন যে, ‘বলদীপনা’ বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে-সেটা যখন বোঝে তখন করার কিছু থাকে না। রবীন্দ্রনাথের কবিতা লেখকদের আর পরবর্তীকালে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

 

বলছিলাম, পাঠ্যপুস্তকের কবিতা-গল্প পরিবর্তন নিয়ে। এ জন্য তদন্ত কমিটি পর্যন্ত হয়েছে। আমার কাছে তথ্য নেই সেই তদন্ত কমিটি এখন কোথায় আছে। বিষয়টা হলো- এটা তদন্তের বিষয় নয়। আমাদের দু’জন শিক্ষামন্ত্রী আছেন না? তারা কী করেছেন। সময় মত পরীক্ষা নেয়া, আর রেজাল্ট দেয়া দায়িত্ব বটে, তবে একমাত্র দায়িত্ব নয়। প্রশ্ন ফাঁসে কত যে ব্যবস্থা নিচ্ছেন তার হিসাব নেই।

 

এখন সর্বশেষ এসে দাঁড়িয়েছে- তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্ন ছাপিয়ে পরীক্ষা নেয়া। আসলে সর্বত্র যদি ভূতের ছড়াছড়ি হয় তবে শর্ষে দিয়ে ভূত ছাড়ে না। তখন অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে হয়। সেটা এই সমাজে নেয়া সম্ভব না। যদি তাই হতো তবে- নির্মাণের এক বছরের মধ্যে কেন্দ্রীয় কারাগারের ভবনে (কেরানীগঞ্জ) ফাটল দেখা দিত না। রাজধানীর মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভারের কাজ কবে শেষ হবে কেউ জানে না। এখানে শুধু সময় বৃদ্ধি আর বাজেট বৃদ্ধি করা হচ্ছে। জনগণ শুধু জানে তাদের দুর্ভোগ সহসা শেষ হচ্ছে না।

 

সময় বাড়াতে পারলেই বাজেট বৃদ্ধি পাবে। আর তাতে ঠিকাদারের পকেট ভারি হবে। এক বছর না যেতেই রাস্তার কার্পেটিং নষ্ট হয়। কেননা তাতেই লাভ। আবার ঠিকাদারি পাওয়া যাবে। পকেট ভারি হবে সবার। জবাবদিহিতা না থাকলে যা হবার তাই হচ্ছে। জবাবদিহিতা থাকার জন্য কিছু শর্ত থাকা চাই। সমাজটা এখন সেই সব শর্তের অনেক উপরে উঠে গেছে। তাই ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’।

 

 গোলমেলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো গোলমেলে করার অভিযোগ করেছেন শিক্ষাবিদরা। একটা দেশে কয়টা শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি যদি বোর্ড দেয় তবে আর থাকলো কী? পৃথিবীর দেশে দেশে কয়টা করে শিক্ষা ব্যবস্থা আছে? আমরা ছেলে-মেয়েদের বাংলা, ইংরেজি, মাদ্রাসা সব এক সাথে চাপিয়ে দিচ্ছি। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটা কারণ হচ্ছে- যারা বর্তমান সমাজের ধারক-বাহক তারা শ্রেণিগতভাবে উচ্চ শ্রেণির।

 

এই শ্রেণির ছেলে-মেয়েরা হয় শুরু থেকেই বিদেশে পড়ে নয়তো একটা সময়ে বিদেশে পাড়ি দেয়। অতএব তাদের জন্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কী হলো তাতে কিছু যায় আসে না। তাদের উদ্দেশ্য হলো- রাজনীতিটা হাতে আছে কি-না। অর্থনীতির চিত্রটার মত। সবাই ব্যস্ত আছিÑ আমাদের প্রবৃদ্ধি কত হচ্ছে তা নিয়ে।

 

 সাতের নিচে না উপরে। যেন জীবনের সচ্ছলতার এটাই একমাত্র মাপকাঠি। এ ব্যাপারে ইউএনডিপির হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অফিসের পরিচালক সেলিম জাহান একটি সংবাদ সংস্থার সাথে সাক্ষাৎকারে সেদিন বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত কোনো মূল্য নেই, যদি না সেটা জনগণের কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত না হয়।’ যা হোক, অনেক কিছু মিলে অন্ধকারটা গভীর হচ্ছে। এক কথা থেকে অন্য কথায় চলে এসেছিলাম। আসলে হয়েছে কি, কোনটাকে বাদ দিয়ে কোনটা নয়। বেলিফুলের মালার মত। সব একই সুতায় গাঁথা। সে জন্যই তো কান টানলে মাথা আসে।

 

 শুরুর কথায় ফিরে যাই। বলছিলাম ছায়ানট আর সনজীদা খাতুনের কথা। এবারের বাংলা নববর্ষ পালন এবং আরো কতিপয় ঘটনায় ড. সনজীদা খাতুন যে বক্তব্য রেখেছেন (একটি সংবাদ সংস্থা থেকে নেয়া) তা এমনÑ ‘সমাজে সাম্প্রদায়িক অন্ধকারের নতুন সঞ্চার রুখতে বঙ্গাব্দ ১৪২৪ এর প্রথম প্রভাতে নতুন স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক এসেছে ঢাকার রমনা বটমূল থেকে।

 

ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেছেন, এই সংগ্রাম হবে বাঙালির আত্মপরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর সত্য ধর্ম নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সংগ্রাম। অস্ত্র নয়, এই সংগ্রামের হাতিয়ার হবে সংস্কৃতি। পৃথিবীর আবর্তনে প্রতিদিনের মতো সূর্য উঠলেও শুক্রবার (পহেলা বৈশাখ) তা ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে এসেছে বাংলাদেশে।

 

 এ সূর্য যে ভোর নিয়ে এসেছে, তাতে বাংলা পঞ্জিকায় সূচনা ঘটেছে নতুন বছরের। চির নতুনের ডাক দিয়ে আসা পহেলা বৈশাখ রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে বাঙালির মনে; নারী-পুরুষের রঙিন সাজে, শিশুর মুখের হাসি আর বর্ণিল পোশাকে তারই প্রকাশ।

 

নানা আয়োজনে, নানা আঙ্গিকে সারা দেশে চলছে বর্ষবরণ। নিদাঘের ‘অগ্নিস্নানে’ শুদ্ধ হয়ে ওঠার প্রত্যাশার সঙ্গে এবার বৈশাখী আবাহনে মিশেছে প্রতিবাদের সুর। অগ্রগতির বিপরীতে যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে উগ্রপন্থা; শুভবোধের বিপরীতে যখন শোনা যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক হুঙ্কার, তখনই বাংলার হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক শক্তিকে নতুন করে উপলব্ধি এসেছে এবারের বর্ষবরণ উৎসবে।’

 

খবরে বলা হয়, ‘পাকিস্তানি দমন-পীড়নের মুখে যে অনুষ্ঠানকে ধরে বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ পেয়েছিল, সেই বর্ষবরণ উৎসবের হালের চিত্রে হতাশা প্রকাশ করে এর অন্যতম উদ্যোক্তা সনজীদা খাতুন বলেন, আমাদের ভাবনায় ছিল মনের উৎকর্ষ সাধন।’ সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে সনজীদা খাতুন বলেন, ‘জায়গাটা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছিলেন বন্ধু নওয়াজেশ আহমেদ। বর্ষবরণ ছিল বাঙালি জাতির জাগরণের যাত্রা।

 

 এটার মধ্য দিয়ে আমরা মানুষের মনে স্বাধিকার চেতনা জাগ্রত করতে চেয়েছিলাম।’ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও নিজের মতো করে নতুন বাংলা বছরকে বরনের কথা জানান সনজীদা খাতুন। ‘সেদিন আমি ছিলাম সাভারের একটি গ্রামের মাটির ঘরে। সেখানে বটমূল কল্পনা করে বসে আমার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সকাল বেলা গান গেয়েছিলাম। মানে পহেলা বৈশাখ হবে না, তা তো হতে পারে না।

 

আমরা পারিবারিকভাবে পালন করেছিলাম। বড় করে আয়োজন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। অনেকেরই নাম ছিল এলেমিনেশন লিস্টে।’ মনের সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ হলে মানুষ বদলে যায় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সেই বদলের চেষ্টা করে চলেছি। তবে আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে।

 

 সাংস্কৃতিক চেতনার বদলে ‘হৈ চৈ’ বর্ষবরণের সুর হয়ে ওঠায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ মানুষ বাঙালিত্ব কাকে বলে জানে না, এমনকি রাষ্ট্রও সেটা জানে না। দীর্ঘকাল ধরে দেখে আসছি রাজনীতি যারা করেন, যারা মানুষের জন্য ‘হায় জনগণ’, ‘হায় জনগণ’ করেন, তারা আত্মউন্নতির কথা ছাড়া আর কিছুই ভাবেন না। এ চিরকাল দেখে এসেছি।

 

প্রগতিশীল সমাজ কীভাবে ডানপন্থার দিকে যাচ্ছে, তা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড যেমন দেখেছি, জঙ্গিবাদও দেখতে হচ্ছে। একটি সমান্তরাল লড়াই চলে আসছে। এখনও এ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু শহরে বসে সংস্কৃতি চর্চা করলে হবে না, যেতে হবে গ্রামের মানুষের কাছে। মুক্তিযুদ্ধের কথাবার্তা, ইতিহাস, মানবিক দিক, ধর্মের নামে যে অন্যায় হচ্ছে- এসব সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে।’  
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
atalkaratoa01552@gmail.com
০১৫৫২-৩২২৯৪২



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top