রাত ৯:৪৮, বৃহস্পতিবার, ২৯শে জুন, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / অচেনা শহর
অচেনা শহর
মার্চ ২৬, ২০১৭

মো. শামীম মিয়া : বাবা ঢাকা শহরে গেছেন, আসবেন সাত দিন পর তা ছোট্ট ইতি জানতো। তবুও মাকে বার বার জিজ্ঞাসা করে মা বাবা ঢাকা থেকে কখন আসবে ? মা ইতির মনের অবস্থা বুঝতে পারে, ইতির মনটা বেশ খারাপ কেননা বাবাই যে ইতির একমাত্র খেলার সাথী । ইতিও যেন বাবার কলিজার এক টুকরো মাংস। অভাব অনটনের সংসার জীবন বাঁচানোর তাগিদে ছুটতে হয় শহরে।

 ঢাকা যাওয়ার সময় বাবা ইতিকে বলে গেছেন বাড়ীতে আসার সময় তোমার জন্য অনেক গুলো খেলনা নিয়ে আসবো। ইতিও ঝটপট বলে দিয়েছে, মাটির হাড়ি পাতিল আনবা, আমি ভাত তরকারী রান্না করবো তুমি আর মা খাবে। বাবা ইতির কপালে একটা চুমা দিয়ে চলে গেলেন ।

রাত হলেই ইতি ছটফট করতো, কান্না করতো, সহজে ঘুমায়না, রোজ রাতে নতুন একটা গল্প বলতেই হবে। মা বেশি গল্প জানতো না, যা জানতো সব বলা শেষ। মা ইতিকে শান্তনা দিতো তোমার বাবা ঢাকা থেকে অনেক অনেক গল্প শিখে আসবে, বাবা না আসা পযন্ত শুধু ঘুমাও আর ঘুমাও।


সাতদিন হয়ে গেছে, বাবা আসবে বলে ইতি এখনো কিছু মুখে দেয়নি। যাকে দেখা পায় তাকেই বলে, আজ আমার বাবা আসবে, আমার জন্য অনেক কিছু আনবে। ইতি বাবার পথও চেয়ে বাড়ীর সামনে বড়ই গাছটার নিচে বসে আছে। অনেকক্ষন হয়ে গেলো বাবা আসছে না ইতি দৌড়ে একবার মার কাছে যায়, আরেক বার গাছটার নিচে আসে। সন্ধ্যা হয়ে এলো তবুও বাবার খোঁজ নেই।

 সন্ধ্যার ঝাঁপসা আলোতে দুর দুরান্তে দুইটা লোককে দেখা যাচ্ছে, ইতি দৌড় দেয় লোক দুটির দিকে। কাছে গিয়ে দেখে হ্যাঁ তার বাবা এবং এক চাচা আসছে। ইতি বাবার কাছে গিয়েই বাবাকে ঝাপটে ধরে আর বলে, বাবা তোমার জন্য সকাল থেকে ঐ বড়ই গাছটার নিচে বসে আছি তুমি আসবে বলে। বাবা ইতিকে কোলে নিয়েই চুমা খেতে লাগলো। হঠাৎ চাচা বললো, কীরে কিভাবে আসলি দেশের যে অবস্থা তোর কোন সমস্যা হয়নি তো ? বাবা বললো, অল্পের জন্য বেঁচে গেছি মিলিটারিদের হাত থেকে।

 ঢাকা শহরের করুন অবস্থা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের যেন সেখানেই সূচনা এককেটা রাত যেন সেখানে ভয়াল কালরাত্রির মত, পোড়া কাঠ আর লাশ জননীর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা একেক দিনের নতুন সূর্য উঠছে। ইতি বাবার মুখের  দিকে তাকিয়ে আছে, আর শুনছে বাবার কথা গুলো।

চাচা বললো, এখানেও তো কম নয়। বাড়ীর কাছে আসা মাত্রই চাচা বাবাকে বললো, পরে কথা হবে এই বলে তিনি চলে গেলেন। আঙ্গিনায় বাবা আসা মাত্রই ইতি বাবার কোল থেকে নেমেই চটের ব্যাগটা খুলতে থাকে আর বলে বাবা আমার জন্য কি কি এনেছো ?

 বাবা বললো, তুমি যা যা চেয়েছো আমি তাই এনেছি মা। ঘরে গিয়ে সব বের করো। ইতি মাথা নাড়িয়ে চলে যায় ঘরে। বাবা ইতির মার কাছে এসে বলে ইতির মা দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে পাকিস্তানী বাহিনী পরিকল্পিত ভাবে গণহত্যা করছে বাঙালিদের ।

আমরা বাঙ্গালীরাও পাকিস্তানীদের উচিত শিক্ষা দিবোই। মা বললো, হ্যাঁ আমিও শুনলাম সেদিন রহমতের কিশোরী বোনটাকে পাকিস্তানীরা ধরে নিয়ে মেরে ফেলেছে। মার দু-চোখে তখন দু-ফোঁটা পানি টলমল করছিলো। বাবা বললো, ইতির মা পাকিস্তানীরা আমাদের দেশকে তাদের আয়ত্তে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা করছে।

 কিন্তু আমরা জনতা ছাত্র সমাজ পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবোই। ইতির মা আমার বাবা বলতো , মানুষের যত গুলো অনুভুতি আছে তার মধ্যে সুন্দর অনুভুতি হচ্ছে ভালোবাসা। আর এই পৃথিবীতে যত গুলো ভালোবাসা আছে তার মধ্যে তীব্র ভালোবাসা টুকু হতে পারে শুধু মাত্র মাতৃভুমির জন্য। যারা কখনো নিজের মাতৃভূমির জন্য ভালোবাসা টুকু অনুভব করেনি তাদের মতো র্দুভাগা আর কেঊ নেই। ইতির মা আমি সৌভাগ্যবান হতাম যদি যুদ্ধে যেতে পারতাম।

 ইতির মা জানতো বাবা এই কথাই বলবেন, মা বাবার দিকে তাকিয়ে বললো, হ্যাঁ আমি চাই তুমি যুদ্ধে যাও দেশ মাকে রক্ষা করো পাকিস্তানীদের হাত থেকে। রক্ষা করো দেশের লক্ষ লক্ষ মায়ের সম্মান। মার দু-চোখে দু-ফোটা জল চিকচিক করছিলো। মা আরো বললো, ইতির বাবা আমার যদি উপযুক্ত এক মাত্র সন্তান থাকতো তাহলে আমি অনেক আগেই তাকে যুদ্ধে পাঠাতাম।

 বাবা বললো, কিভাবে যুদ্ধে যাবো জানিনা, কার সাথে যাওয়া যায় বলতো ইতির মা ? মা বললো, রহমত না কি যুদ্ধে যাবে। তুমি ওর সাথে কথা বলো। বাবা ঘরে না যেয়ে গেলেন রহমতের বাড়ী। রহমত বাবার মুখে দেশ প্রেম ও অন্তরে দেশের জন্য ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হলেন, এবং বললেন তুমি বাড়ী যাও যে কোন সময় আমরা যুদ্ধে যাবো। বাবা মাথা নাড়িয়ে বললো, ঠিক আছে। এই বলে বাবা  এলেন বাড়িতে। অনেক রাত হয়েছে বাবা ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই দেখেন ইতি চুপটি করে বসে আছে বাবার অপেক্ষায়।

 বাবা বললেন, মা তুমি ঘুমাওনী এখনো ? ইতি বললো, বারে তোমার মুখে গল্প না শুনে কী আমি ঘুমিয়েছি কখনো ? বাবা ইতির কপালে চুমা দিয়ে বললো, ঠিক আছে তাহলে গল্প শোনো। আজ তোমাকে নতুন একটা গল্প বলবো গল্পের নাম অচেনা শহর।

সেখানে তারাই যেতে পারে যাদের কে সৃষ্টির্কতা পছন্দ করে। তবে একদিন সেই দেশের বাসিন্দা আমরা সবাই হবো। যারা এই পৃথিবীতে ভালো কাজ করবে তারা সেখানে বিশালবহুল বাড়িতে থাকবে, কোনকিছুর অভাব থাকবে না। ইতি মনোযোগ সহকারে শুনছে বাবার কথা।

 বাবা বললো, শহরটার চারদিক থাকবে ফুলে ফলে ভরা যার যা মন চাইবে তাই পাবে। পরীর মত উড়তেও পারবে। সেই শহরে সবাই যখন যে যেথায় যেতে চাইবে সেথায় যেতে পারবে। মা পাশের রুম থেকে বললো, ইতির বাবা খেতে এসো সারাদিন তো কিছুই খাওনি ইতিকেও নিয়ে এসো। বাবা মার কথার উত্তর দেওয়ার আগেই শুরু হলো ঠাসঠাস গুলির শব্দ ।

 মা দৌড়ে এলেন এ ঘরে এসে ইতিকে বুকে জড়িয়ে নিলেন আর বললেন ইতির বাবা গ্রামে হয়তো  মিলিটারি ঢুকে পড়েছে। ঘরের আলোটা নিভে দাও যাতে ওরা মনে করে এখানে কোন মানুষ থাকেনা। বাবা তাই করলেন । প্রায় দশ মিনিট পর দয়জায় কে যেন কড়া নাড়ছে ? ইতির মা ইতিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আছে। বাবা হাতে নিলেন ইয়া বড় একটা লাঠি।

 বাবা রাগি কন্ঠে বললেন কে ? উত্তর এলো মৃদু কন্ঠ আমি রহমত দরজা খোলো। বাবা দরজা খুলে দিলেন, রহমত ঘরে ঢুকে নিজেই দরজা বন্ধ করে বললেন আমাদের কে এখনি যেতে হবে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানীরা। বাবা অনেক আগেই ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে । বাবা করুন মুখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

 মা দু-চোখের পানি মুছে বললো, কিছু খেয়ে যাও সারাটা দিন মুখে কিছুই দাওনি ? বাবা কিছু বলার আগেই রহমত বললো, ভাবী আমাদের সাথীরা বটতলায় অপেক্ষা করছে, গ্রামের পশ্চিমে গোলাগুলি হচ্ছে, আমাদের এখনি যেতেই হবে। বাবা আর কোন কথা না বাড়িয়ে তার গায়ের চাদরটা নিলেন, দেখলেন ইতি ঘুমিয়ে গেছে অনেক আগেই, বাবা ইতির কপালে একটা চুমা দিয়ে কাদা কন্ঠে বললেন, ইতির মা ইতিকে দেখে রেখো। মা কথা বলা মাত্রই কেঁদে উঠতেন তাই মাথা নাড়িয়ে বললেন ঠিক আছে। নিজের কষ্ট বুকে রেখে শুধু মা বললেন, নিজের প্রতি খেয়াল রেখো।

 বাবা আর রহমত চলে গেলো, যুদ্ধের উদ্দেশ্যে। মা ঘরের আলো নিভে দিয়ে নিরবে কাঁদছে। এদিকে ইতি ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে ভাঁসছে । ইতি স্বপ্নে এসেছে সেই অচেনা শহরে, ঐ যে দুর দুরান্তে পরীর মতো ডানাসহ বাবাকে দেখা যাচ্ছে, সঙ্গে রহমত চাচাও আছে। ইতি দৌড়ে যায় সেখানে বাবা, বাবা বলে ডাকছে বাবা কেন যেন শুনচ্ছে না। রহমত চাচা, চাচা বলে ডাকলেও শুনচ্ছে না।

 ইতি বাবা এবং চাচাকে ধরতে চায় কিন্তু ধরতে পারেনা। বাবা আর রহমত চাচা এই ফুলের গাছ থেকে অন্য ফলের গাছে যাচ্ছে। সবাই মিলেমিশে উড়ে বেড়াচ্ছে কারো সাথে কারো ঝগড়া নেই। আমাদের দেশের মতো নেই গোলাগুলি। সবার মুখেই হাসি। ইতি ক্লান্ত হয়ে বসে পরে এবং বাবার সাথীদের বলে আমার বাবাকে একটু ডেকে দাওনা কেউ কী আমার কথা শুতে পারছো না ?

 হঠাৎ বাবা চোখের আড়ালে চলে গেলো ইতি বাবাকে আর খুজে পেলো না। হঠাৎ ইতি ঘুমের মধ্যে চিৎকার দিয়ে উঠলো, বাবা আমায় ছেড়ে যেওনা বাবা। মা পাশের রুম থেকে দৌড়ে এসে বললো, কি হয়েছে মা। ইতি চোখ মেলে দেখলো অনেক আগেই সকাল হয়েছে।

ইতি মাকে অচেনা শহরের কথা বললো। মা চোখে পানি আর রাখতে পারলো না, কেন না মা তো বুঝেছে বাবা অচেনা শহর বলতে কোন শহরের কথা বোঝাচ্ছে। মা বুঝে গেছেন তার স্বামী হয়তো শহীদ হয়েছে যদি ইতির স্বপ্ন সত্য হয়। দিনের পর দিন চলে যায় বাবা আর ফিরে আসেনা।

 ইতি আর মা সেই বড়ই গাছের নিচে বসে থাকে বাবার আশায় বাবা আসবে বলে। একদিন এই দেশটা স্বাধীন হলো। সবাই লাল সবুজ পতাকা নিয়ে আনন্দ মিছিল করছে ইতি হাতের ইশারাই, মাকে বললো দেখো মা ঐ দেখো লাল সবুজ পতাকার মধ্যে বাবাকে দেখা যাচ্ছে, বাবা হাসছে। মা বাকশূন্য অবস্থায় লাল সবুজ পতাকার দিকে পাথর চোখে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে ঝরনার মতো পানি ঝড়ছেই।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top