হাজারো মানুষ খোলা আকাশের নিচে
ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে বিধ্বস্ত দেশের উপকূল। ঝড়ের তা বে নিহত হয়েছে ২০ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, বিদ্যুতের খুঁটি ও আবাদি ফসল। গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার মানুষ খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। তাদের কাছে পৌঁছায়নি পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী। স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। মহাসেনের আঘাতে কক্সবাজারে তিন শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার মহেশখালী উপজেলার দলঘাটা ইউনিয়ন, মহেশখালীর সোনাদিয়া, ঘটি ভাঙ্গা, কুতুবদিয়ার তবলারচর, উত্তর ধুরুং, দক্ষিণ ধুরুং, টেকনাফের শাহা ফরিরদ্বীপ, সেন্টমার্টিন ও মিলার কিছু অংশে মহাসেনের প্রভাবে ৫ থেকে ৭ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার তিন শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, \'ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুদ রয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদেরকে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা চূড়ান্ত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুক্রবার বিকেলের মধ্যে ওই তালিকা চূড়ান্ত হবে। তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণসমাগ্রী পৌঁছানো হবে।\' ঝড়ের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পটুয়াখালী। জেলা খেপুপাড়া ও গলাচিপা উপজেলার এখন পর্যন্ত রয়েছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। রাস্তায় উপছে পড়া গাছপালা পড়ে থাকায় সেখানে এখনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। জেলা প্রশাসক অমিতাভ ভৌমিক জানান, ঝড়ে জেলার আংশিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮ হাজার ২৩৮টি। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭ হাজার ৫৪০টি কাঁচা ঘরবাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নের সংখ্যা ৭২। প্রথামিকভাবে দুর্গতের জন্য ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও ২শ\' মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছেনি। মহাসেনের তা বে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় এক হাজারের মত কাঁচা ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিনশতাধিক। সেখানেও পৌঁছায়নি ত্রাণসামগ্রী। দ্বীপের তমরুদ্দি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান (ইউপি) আলাউদ্দিন বাবু বলেন, \' বৃহস্পতিবারের ঘূর্ণিঝড়ে তার ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ৭০টি পরিবার খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কোন ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানো হয়নি।\' খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার হাতিয়া উপকূল দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে হাতিয়া দ্বীপের তিন শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের তাদের ঘরবাড়িতে যেতে শুরু করেন। কিন্তু যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা সবাই এখন খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন। হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহিদুর রহমান শুক্রবার সকালে বলেন, \'ঝড়ে দ্বীপের বিচ্ছিন্ন নিঝুমদ্বীপ, নলের চর, কেয়ারিং চর, ঢালচর, জাগলার চর, নঙ্গলিয়ার চর, চর বাসারসহ মূল ভূ-খ ের ১২টি ইউনিয়নে এক হাজারের মতো কাঁচা ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ে রাস্তাঘাট, গাছপাল্লার ও ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবারের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো হবে।\' এদিকে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজ-খবর নিতে হাতিয়ায় যাচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আজিম গ্রুপ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম। তিনি ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ মেহেদি হাসান জানান, উপজেলার মোহাম্মদপুর, চরক্লার্ক, চরবাটা, চরজুবলি ইউনিয়নে ঘুর্ণিঝড় মহাসেন আঘাত হানে। এ সময় কয়েক শতাধিক কাঁচাঘর বিধ্বস্ত হয় এবং শতাধিক গাছ উপড়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ফসলের মাঠে পানি জমেছে- যার কারণে কৃষকরা অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিমাণ যাচাই করে সহযোগিতা করা হবে।\' কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল আউয়াল জানান, ঝড়ের আঘাতে উপজেলার প্রায় কয়েকশ\' কাঁচাঘর বিধ্বস্ত ও বেশ কিছু গাছপালা উপড়ে পড়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে এখনো পর্যন্ত কোন ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি বলে জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। সার্বিক বিষয়ে শুক্রবার সকালে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, আমাদের আগাম প্রস্তুতি থাকায় জানমালের তেমন ক্ষতি হয়নি। তবুও যেটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপনের কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারিভাবে সাহায্য সহযোগিতা করা হবে।
মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
পিরোজপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় মহাসেনে পিরোজপুরে মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে প্রায় দুইশ\' ঘের ও পুকুরের মাছ। পিরোজপুর সদর, জিয়ানগর ও মঠবাড়িয়া উপজেলার এই ক্ষয়ক্ষতির তথ্য দিয়েছেন জেলা মৎস্য বিভাগের উপপরিচালক মো. অলিউর রহমান। তিনি জানান, প্রবল বর্ষণ ও জোয়ারের কারণে পিরোজপুর সদর, জিয়ানগর ও মঠবাড়িয়া উপজেলার ১ হাজার সাতশ\' ৬৮টি ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ে ওই তিনটি উপজেলাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। পুনর্বাসনে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন তারা। অবশ্য ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষিরা কবে নাগাদ মৎস্য পুনর্বাসনের আওতায় আসবেন সে ব্যাপারে তেমন কিছু জানাতে পারেননি জেলা মৎস্য বিভাগের উপপরিচালক মো. অলিউর রহমান।
কক্সবাজারে ঘর গোছাতে ব্যস্ত মানুষ
কক্সবাজার প্রতিনিধি: ঘূর্ণিঝড় \'মহাসেন\' আতঙ্ক কেটে যাওয়ার পর ঘরে ফিরেছে উপকূলের মানুষ। এখন পুরোদমে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ঘর গোছাতে। সরিয়ে নেয়া জিনিসপত্র বাড়িতে আনাসহ আনুষঙ্গিক কাজে সারাদিন পার করেছে তারা। অনেকটা উৎফুল্লও দেখা যাচ্ছে তাদের কাজে। বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও এতে অংশ নিচ্ছে। যেন নতুনভাবে বসতি গড়ছেন তারা। কথা বলে জানা গেছে, চরম ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও মহাসেনের আক্রমণ থেকে রক্ষাই এ উৎফুল্লতার কারণ। শুক্রবার সরেজমিনে কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়া এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। সমিতি পাড়া ওয়ার্ড কাউন্সিলর আকতার কামাল জানান, ঘূর্ণিঝড় মহাসেন আঘাত হানলে সমিতিপাড়ার সব বসতি বিলীন হয়ে যেত। আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে যে কষ্ট পোহাতে হয়েছে তা এখানকার লোকজনের ওপর প্রভাব ফেলেনি। সোনাদিয়ার পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা পরিবেশকর্মী গিয়াস উদ্দিন জানান, মূল ভূ-খ ের সাথে সোনাদিয়া ও বড়দিয়ার সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এ কারণে জিনিসপত্রসহ দীর্ঘ দু\'কিলোমিটার হেঁটে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে এখানকার মানুষের অসহ্য কষ্ট পোহাতে হয়েছে। তারপও মহাসেনের আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ায় সবাই শ্রষ্ঠার কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন এবং খুশি মনে ঘর গোছাচ্ছেন। ধলঘাটার ইউপি সদস্য নবী হোসেন আজাদ জানান, ধলঘাটার মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নৌ-পথই একমাত্র মাধ্যম। ফলে জিনিসপত্রসহ পরিবার-পরিজন নিয়ে নৌপথ পাড়ি দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে এখানকার মানুষের সীমাহীন কষ্ট পোহাতে হয়েছে। তারপরও মহাসেন থেকে রক্ষা পেয়েছে এটাই বড় কথা। শুক্রবার সকাল থেকে সবাই ঘরে ফিরে ঘর গোছাচ্ছে। এদিকে মহাসেন থেকে রক্ষা পাওয়ায় জেলাব্যাপী শুক্রবার জুমার নামাজে শুকরিয়া আদায় করে মোনাজাত হয়েছে বলে জানা গেছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের উপসহকারী পরিচালক নাজমুল হাসান জানান, আতঙ্ক একেবারেই কেটে গেছে। সন্ধ্যার পর সতর্ক সংকেত পুরোপুরি তুলে নেয়া হবে। জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন বলেন, \'কয়েকদিন ধরে উপকূলের মানুষসহ পুরো জেলাবাসী চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করেছে। উপকূলের মানুষকে বসতবাড়ি ছেড়ে আসতে নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তারপরও আল্লাহ যে মহাসেনের কবল থেকে এ এলাকার মানুষকে বাঁচিয়েছে এ জন্য হাজার হাজার শুকরিয়া।\' ডিসি আরও বলেন, \'মহাসেনের আশঙ্কা কেটে যাওয়ার পর সবাইকে ঘরে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। আশ্রয় নেয়া সব মানুষ ফিরে ঘর গোছাচ্ছে।\'
ঘূর্নিঝড়ে পটুয়াখালীতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
পটুয়াখালী প্রতিনিধি : বৃহস্পতিবারের ঘূর্ণিঝড় মহাসেনে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর ৪০ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এদিকে,ফসলের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে কৃষি বিভাগ কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক এ জেড এম মোমতাজুর করিম। তবে, আনুমানিক ৪০ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি ধারণা করছেন। এসব জমিতে উড়তি কাচা মরিচ, তিল, ঢেড়শ, সূর্যমূখী, মিষ্টি আলু, খেসারী ও মুখ ডাল এবং বিভিন্ন জাতের সবজি আর আউশ এবং বোরোর বীজতলা নষ্ট হয়েছে। এর ফলে চলতি মৌসুমে গোটা জেলায় উল্লেখিত ফসলের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা হলেন-রাঙ্গাবালী উপজেলার চরবাংলার কৃষক আবু হানিফ, দশমিনা উপজেলার চর বাশবাড়িয়া এলাকার কৃষক সোবাহান, কলাপাড়ার লতাচাপলি ইউনিয়নের ইয়াসিন মৃধা। পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক অমিতাভ সরকার জানান, কৃষকের ক্ষতির ব্যাপারটি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এছাড়া কৃষি বিভাগকে সব প্রকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করে তালিকা দিতে বলা হয়েছে।
সাতক্ষীরায় বেড়িবাঁধ নিয়ে শঙ্কা
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাত থেকে রক্ষা পেলেও সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার মানুষের মধ্যে বেড়িবাঁধ নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন শঙ্কা। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ২০ হাজার আশ্রিত মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে নিজ বাড়িতে ফিরেছে। শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলাম জানান, ওয়াপদার বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় তিনটি পয়েন্ট ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পশ্চিম পাতাখালী ও ঝাপার মধ্যবর্তী স্থান, পূর্ব পাতাখালী বাজারের উত্তর পাশে এবং কামালকাঠি প্রাইমারি স্কুলের দক্ষিণ পাশের বেড়িবাঁধ রয়েছে বেশি ঝুঁকিতে। ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব অর্থায়নে মাটি ভর্তি বস্তা ফেলে ও বাঁশ দিয়ে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছে এলাকাবাসী। এদিকে, সাতক্ষীরা সুন্দরবন সংলগ্ন কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, আড়পাঙাশিয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন কমপক্ষে ৩০টি স্থানে বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হলেও কোনো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় বাঁধগুলো মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না।
ঝালকাঠিতে ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ফসলের ক্ষতি
ঝালকাঠি প্রতিনিধি : ঝালকাঠিতে ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে সহগ্রাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি, অসংখ্য গাছপালা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও চলতি মৌসুমের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র জানায়, জেলার বিভিন্নস্থানে বিধ্বস্ত হয়েছে কাঁচা ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি। বিরামহীন বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। ধসে পড়েছে সুগন্ধা ও বিষখালির বেড়িবাঁধ, দেখা দিয়েছে ভাঙন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. তাওফিকুল আলম জানান, বিভিন্ন ধরনের সবজি, মুগ, তিল, আউশ ধান, সূর্যমুখী ও ভুট্টার বেশ ক্ষতি হয়েছে। তবে দ্রুত পানি নেমে যাওয়ায় ক্ষতি কম হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) একেএম সোহেল জানান, নদী নিকটবর্তী মানুষকে আগেই সরিয়ে নেওয়ার কারণে এ জেলার হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। মহাসেনের কারণে জেলার ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান করে শিগগিরই ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুয়াডাঙ্গায় কাল বৈশাখী ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : চুয়াডাঙ্গায় কালবৈশাখী ঝড়ে পাকা ধান, কলাবাগান, পেঁপে বাগান, পানের বরজ ও গাছের আমসহ কাঁচা ঘর-বাড়ি ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত জেলার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা ও জীবননগর উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হানে। চুয়াডাঙ আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ জাহিদুল ইসলাম জানান, বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার। ঝড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হন। চুয়াডাঙা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হরিবুলা সরকার জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে পাকা ধান, কলা বাগান, পেঁপে বাগান, আমসহ পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
৪০ ঘণ্টা পরেও বরগুনা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন
বরগুনা প্রতিনিধি : ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের প্রভাবে বরগুনার চারটি উপজেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। বুধবার রাত ১টা থেকেই সদর, বামনা, বেতাগী ও পাথরঘাটা উপজেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুক্রবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত তা স্বাভাবিক হয়নি। আজ শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ এই চার উপজেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বরগুনা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি জানান, বৈদ্যুতিক লাইনের উপর প্রচুর গাছ পড়েছে। এতে করে অসংখ্য জায়গায় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেছে। তা ঠিক করতে একটু সময় লাগবে। ঝড়ের পর পরই বিদ্যুৎ বিভাগের একশ\' কর্মী কয়েকটি টিমে ভাগ হয়ে কাজ শুরু করেছে বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী। জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল ওয়াহাব ভূঁইয়া জানান, বিষয়টি তারা তদারকি করছেন। এদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় এ চার উপজেলার মানুষকে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব জায়গায় ইন্টারনেট ব্যবস্থাও নাজুক হয়ে পড়ায় সংবাদকর্মীদের ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে বলে জানান দেশের প্রথম কমিউনিটি রেডিও স্টেশন লোকবেতারের স্টেশন ব্যবস্থাপক মনির হোসেন কামাল।
লক্ষ্মীপুরে বিধ্বস্ত অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের কারণে লক্ষ্মীপুর সদর ও রামগতি উপজেলায় অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে কয়েক হাজার একর জমির ফসল। বৃহস্পতিবারের এ ঝড়ে রামগতি উপজেলার চরগজারিয়া ও সদরের চররমনী মোহন ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত এবং স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট উচ্চতার নদীর জোয়ারের পানিতে রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও চররমনীতে সয়াবিন, বাদাম, মরিচ, মুগ-মুশুরী, ফেলনসহ অন্যান্য ডাল জাতীয় ফসল, বরবটিশীম, জিঙ্গা, চিচিঙ্গা, শসা, ঢেঁড়স, বেগুন, ডাটা শাক, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন জাতের শাকসবজি নষ্ট হয়ে যায়। জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওসমান খান বলেন, এখনো ক্ষয়ক্ষতির পুরো হিসাব দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে বেশ কয়েক হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। পরিসংখ্যান শেষ হলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব পাওয়া যাবে। জেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সয়াবিন ও বাদামের, আর কয়েকটা দিন বাদেই যেগুলো ওঠার কথা ছিল কৃষকের ঘরে। গত বছর বেশি লাভ আসায় এবার বেশিরভাগ জমিতে সয়াবিনের আবাদ করেন বলে জানান অনেক কৃষক। স্থানীয়রা জানান, মহাসেনের প্রভাবে মেঘনা নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট বেশি উচ্চতার পানি উঠে চর গজারিয়া, তেলীরচর, বয়ারচর, মেঘারচরসহ নিম্নাঞ্চলের চরগুলো প্লাবিত হয়।
বরিশালে পৌণে ২ লাখ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে
বরিশাল প্রতিনিধি : ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের প্রভাবে প্রবল বৃষ্টিপাত হওয়ায় বরিশাল বিভাগের প্রায় পৌণে দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল পানির নীচে চলে গেছে। দুই-একদিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না বলে জানিয়েছে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক দেবাংশু কুমার সাহা জানান, প্রাথমিকভাবে বিভাগের ৬ জেলার মোট ১ লাখ ৮২ হাজার ৬০৪ হেক্টর ফসল পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ধান, তিল, চীনা বাদাম, মিষ্টি আলু, ভূট্টা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে জানা যায়, বরিশালের ৫ জেলায় ১২ হাজার ৪৬৯ হেক্টর জমির বীজতলার মধ্যে ৮ হাজার ৬২২ হেক্টর পানির নীচে। ৬ জেলার ৮৯ হাজার ৬৭৮ হেক্টর জমির আউশ ধানের মধ্যে পানির নীচে আছে ৫৭ হাজার ৫৪৬ হেক্টর। পিরোজপুরে ১৯ হাজার ১৮০ হেক্টর এবং পটুয়াখালীতে ২ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষেতের কোন ক্ষতি হয়নি। বরিশাল কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা গাজী হারুন অর রশিদ জানান, কিছু কিছু ফসলের ক্ষতি হবে। তবে তা তেমন ব্যাপক আকার ধারণ করবে না। ইতোমধ্যে ক্ষেতে জমে থাকা পানি সরে যেতে শুরু করেছে। ২/১ দিনের মধ্যে বাকী পানিও সরে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন কৃষি কর্মকর্তা হারুন।
চরফ্যাশন ও মনপুরায় সহস্রাধিক কাঁচাঘর বিধ্বস্ত
ভোলা প্রতিনিধি : ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরায় সহস্রাধিক কাঁচাঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়াও বৃহস্পতিবারের এ ঝড়ে এ দুই দ্বীপ উপজেলায় অন্তত ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির পাশাপাশি উপড়ে পড়েছে দুই সহস্রাধিক গাছ। চরফ্যাশনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ৫০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ দুই লাখ টাকা এবং মনপুরার জন্য ৪০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চরফ্যাশনের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূর ই আলম ও মনপুরার ইউএনও আবদুল্লাহ হেল বাকি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। চরফ্যাশনের ইউএনও নূর ই আলম জানান, সেখানকার মুজিবনগর চর মানিকা, ঢালচর ও চর কুকরি মুকরিতে বেশি ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া মনপুরার কলাতলীর চর ও চর নিজামের মানুষেরা বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে জানান সেখানকার ইউএনও আবদুল্লাহ হেল বাকি। চরফ্যাশনে সরজমিনে দেখা যায়, সেখানকার আইচা সড়কের উপরে ঝড়ে পড়া গাছ সরিয়ে নিচ্ছে সড়ক বিভাগের লোকজন। তবে নজরুল নগরের নলুয়া বেড়িবাঁধ সড়কে শত শত গাছ এখনো সরানো হয়নি। ফলে লোকজনের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে। এদিকে চরফ্যাশনে গত তিন দিন যাবত বিদ্যুৎ নেই বলে জানিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। চরফ্যাশনের রসুলপুর এলাকার আবদুল গণি (৩৫), চরমানিকার বিধবা নূর চেহারা বেগম (৬৫), চর মানিকারবেড়ি বাঁধের বিবি কুলসুম (৪৫),জাহানার বেগম (৩৫) জানান, তাদের ঘর ঝড়ে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু এখনো তারা কোন সাহায্য পাননি। চরফ্যাশনের মানিকা ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান, তার এলাকায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তিন শতাধিক পরিবার। চাল বরাদ্দ হয়েছে এক টন। কোন টাকা বরাদ্ধ হয়নি। মনপুরার ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন হাওলাদার জানান, তার এলাকায় পাঁচ শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো কোন বরাদ্ধ পাননি তিনি। ঝড়ে ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুই উপজেলার মানুষ। ভোলার জেলা প্রশাসক খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কৃষি বিভাগ ফসলের ক্ষতির তালিকা করছে। ২/১ দিনের মধ্যে তা জানা যাবে।